NEWSTV24
সমরাস্ত্র তৈরির নতুন যুগে বাংলাদেশ
বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬ ১৭:১৯ অপরাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

প্রতিরক্ষা খাতে রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন ধরে আমদানিনির্ভর সামরিক সরঞ্জামের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের লক্ষ্যে সরকার এবার এগোচ্ছে নিজস্ব সমরাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উৎপাদনের পথে। এবার চীনের কারিগরি সহায়তায় সামরিক ড্রোন উৎপাদনে চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। ফলে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ নিজস্ব ভূখণ্ডে আধুনিক সামরিক ড্রোন তৈরির কার্যক্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলো, যা দেশের প্রতিরক্ষা কৌশল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থান সব দিক থেকেই একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।এ ছাড়া সামরিক সরঞ্জামের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে চট্টগ্রামের মিরেরসরাইয়ে স্থাপিত হতে যাচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা শিল্প অঞ্চল (ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন), যা শুধু দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন খাতও খুলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।ঢাকা সেনানিবাসস্থ বিমানবাহিনী সদর দপ্তরে গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এবং চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন ইন্টারন্যাশনালের মধ্যে ইউএভি ম্যানুফ্যাকচারিং ও অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট স্থাপন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরবিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। মনুষ্যবিহীন আকাশযান উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা স্থাপন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রকল্পের জন্য চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী সামরিক ড্রোন নির্মাণে কারিগরি সহায়তা দেবে চীন। চুক্তির আওতায় চীন বাংলাদেশকে ড্রোন প্রযুক্তির নকশা, উৎপাদন প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তা দেবে। ধাপে ধাপে প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে দেশ নিজস্ব সক্ষমতায় সামরিক ড্রোন ডিজাইন, উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে নজরদারি ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে ব্যবহারের উপযোগী ড্রোন উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হলেও পরবর্তী ধাপে উন্নত সংস্করণ তৈরির সম্ভাবনাও খোলা রাখা হয়েছে।চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসএম কামরুল হাসান, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরী, বিমানবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাসহ সিইটিসি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রতিনিধি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন ।এরই মধ্যে সামরিক ড্রোন নির্মাণের লক্ষ্যে ইস্টাবলিশমেন্ট অব ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট অ্যান্ড ট্রান্সফার অব টেকনোলজি (টিওটি) ফর আনম্যানড এরিয়াল ভ্যাহিকেল (ইউএভি) শীর্ষক প্রকল্প প্রস্তাবের অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিইটিসি ইন্টারন্যাশনালের প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

গত ৬ জানুয়ারি অনুমোদনকৃত ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, ৬০৮ কোটি ৮ লাখ টাকার এই প্রকল্পে ড্রোন ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট, প্রযুক্তি আমদানি ও স্থাপনের জন্য এলসি খোলা এবং পরিশোধ বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৭০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। চার অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রায় এ অর্থ পরিশোধ করা হবে।এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে ১০৬ কোটি টাকা, আগামী ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ প্রত্যেক অর্থবছরে ১৫৫ কোটি টাকা করে এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে প্রায় ১৫৪ দশমিক ৬০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। বাকি ৩৭ দশমিক ৪৭ কোটি টাকা এলসি খোলার চার্জ, ভ্যাট ও সুইফট চার্জ হিসেবে দেশীয় মুদ্রায় পরিশোধ করা হবে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই ড্রোন উৎপাদন কারখানা ও টিওটি আমদানিতে যে অর্থ ব্যয় হবে, সেজন্য বিমানবাহিনীকে বাজেটে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার দরকার হবে না। বিমানবাহিনীর জন্য প্রতিবছর বাজেটে অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি খাতে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা দিয়েই এই ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হবে।এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী দেশেই ড্রোন উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা অর্জন করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ ছাড়া সামরিক ও প্রতিরক্ষা শিল্পে বাংলাদেশকে অংশগ্রহণকারী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চট্টগ্রামের মিরেরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) গভর্নিং বোর্ড সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সভাপতিত্ব করেন। গত সোমবার বেজার গভর্নিং বোর্ড সভায় জানানো হয়, মিরেরসরাইয়ে প্রায় ৮০ একর জমি ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন হিসেবে মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আগে সেখানে ইন্ডিয়ান ইকোনমিক জোন হওয়ার কথা ছিল, সেটি বাদ গেছে। তাই নতুনভাবে পুনর্ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাস্তবতায় প্রতিরক্ষা শিল্পে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে দেখা গেছে, হাইটেক অস্ত্রের চেয়ে গোলাবারুদ ও মৌলিক সরঞ্জামের সংকটই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে প্রাথমিকভাবে গোলাবারুদ, যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য সামরিক উপকরণ উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে বলে জানান তিনি।নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন জানান, বাংলাদেশের সমুদ্র প্রতিরক্ষা, সীমান্ত অপরাধ নজরদারিসহ নানা কাজে ড্রোন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আগে থেকেই ড্রোন তৈরির কথা চিন্তা করছে। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে বেশি দূর এগোনো যায়নি। তিনি আরও বলেন, ড্রোন শুধু সামরিক খাতে নয়, এটি বেসরকারি খাতেও ব্যবহার করা যায়।এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব এনাম খান আমাদের সময়কে বলেন, চীনের কারিগরি সহায়তায় সামরিক ড্রোন উৎপাদনের উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত দিক। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সেই নীতির অংশ। তবে এটি কারও বিরুদ্ধে নয়। বরং নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বাভাবিক প্রয়াস হিসেবে এটিকে দেখা উচিত। তবে ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশও যদি প্রযুক্তি হস্তান্তর করতে চায়, তাহলে সেটি বিবেচনায় নিতে হবে।