ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের জেরে অবরুদ্ধ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবার চালুর উপায় নিয়ে আলোচনা করতে যুক্তরাজ্যের ৪০টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আলোচনা করেছেন। গত বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটেনের পক্ষ থেকে যুদ্ধে না জড়ানোর বার্তা দেওয়ার প্রেক্ষাপটে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। সূত্র জানায়, এতে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।বৈঠকে সভাপতিত্ব করার সময় যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেন, এ জলপথ অবরোধে ইরানের বেপরোয়া মনোভাব আমাদের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে আঘাত করছে। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, আমরা দেখেছি ইরান বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করতে একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ দখল করে নিয়েছে।বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের হামলার প্রেক্ষাপটে পারস্য উপসাগরকে বিশ্বের বাকি মহাসাগরগুলোর সঙ্গে সংযোগকারী প্রণালি হরমুজে প্রায় সব নৌচলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের তেল প্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ পথটি কার্যত বন্ধ হওয়ায় পেট্রোলিয়ামের দাম আকাশচুম্বী করে তুলেছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জলপথটি সুরক্ষিত করা তার দেশের কাজ নয় বলে মন্তব্য করার পর বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
ট্রাম্প যুদ্ধকে সমর্থন করতে ব্যর্থ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্রদেরও সমালোচনা করেছেন এবং ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বৈঠকটিতে অংশগ্রহণকারী যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, কানাডা, জাপান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশ একটি বিবৃতিতে সই করে। এতে তারা ইরানকে প্রণালিটি অবরোধ করার প্রচেষ্টা বন্ধ করার দাবি জানান। সেই সঙ্গে জলপথটি দিয়ে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ প্রচেষ্টায় অবদান রাখার অঙ্গীকার করেন।বৈঠক সূত্রের বরাত দিয়ে লন্ডন থেকে আলজাজিরার ররি চ্যালান্ডস জানান, যুদ্ধ চলাকালে কোনো দেশই বলপূর্বক প্রণালিটি খোলার চেষ্টা করতে ইচ্ছা দেখায়নি। কারণ, ইরান জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, আক্রমণকারী নৌযান ও মাইন দিয়ে জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। চ্যালান্ডস বলেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হরমুজের সমাধান নিয়ে খুবই স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। তিনি এ যুদ্ধে জড়ানোর কোনো আগ্রহ নেই বলে জানিয়েছেন। জোটের বেশির ভাগ দেশই এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। এর আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলপূর্বক হরমুজ খোলার চেষ্টাকে বাস্তবসম্মত নয় বলে বর্ণনা করেন।
এর আগে হরমুজ খোলা নিয়ে গত বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ বন্ধ হলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এটি খুলে যাবে। আলজাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, তিনি হরমুজে নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পরিবর্তে অন্য দেশগুলোকে, বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোকে এই জলপথ ফের চালু করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রায় কোনো তেলই আমদানি করে না এবং এর কোনো প্রয়োজনও নেই।গত বুধবার ট্রাম্প চুক্তিতে না পৌঁছালে ইরানকে প্রস্তর যুগে পাঠানোর হুমকি দেন। দ্য ডন জানিয়েছে, এ বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানকে বোমা হামলার হুমকি একটি বড় ধরনের যুদ্ধাপরাধ ছাড়া অন্য কিছু বোঝায় কিনা। ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাবের সঙ্গে ফোনালাপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ প্রশ্নটিই আমি ফিনিশ প্রেসিডেন্টকে করেছিলাম, যিনি একজন আইনজ্ঞ। পেজেশকিয়ান বলেন, ইতিহাস এমন মানুষে পরিপূর্ণ, যারা অপরাধীদের সামনে নীরব থাকার জন্য চড়া মূল্য দিয়েছেন।
এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালি নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভোটাভুটি পিছিয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল রক্ষায় শক্তি প্রয়োগ নিয়ে ভোটের আগে ইরান জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। এ প্রক্ষাপটে এ ধরনের শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন-সংক্রান্ত গতকাল শুক্রবারের নির্ধারিত ভোটটি নিরাপত্তা পরিষদ স্থগিত করেছে। ১৫ সদস্যের এ পরিষদের বাহরাইনের আনা একটি খসড়া প্রস্তাবের ওপর ভোট দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতের মধ্যেই সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, হরমুজ নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ আগ্রাসনকারী ও তাদের সমর্থকদের যে কোনো উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিস্থিতিকে কেবল আরও জটিল করে তুলবে।শুক্রবার প্রথমবারের মতো জাপানের একটি তেলবাহী জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করে।