NEWSTV24
ডুবে গেল কৃষকের সোনালি স্বপ্ন
বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০১ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের গুয়াছুড়া অংশে এখন দাঁড়ালে মনে হয় এটা কোনো ধানের মাঠ নয়, বিশাল জলরাশি। বাতাসে কাঁপছে না ধানের শীষ, কাঁপছে মানুষের বুক। চারদিকে থইথই পানি, তার নিচে চাপা পড়ে আছে সোনালি স্বপ্ন। কয়েক দিন আগেও যেখানে সোনালি ধান দুলছিল, আজ সেখানে ভাঙা স্বপ্নের নিঃশব্দ চিহ্ন। গতকাল বুধবার কোমরপানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত পলিথিনে মোড়া, যেন বৃষ্টির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকার শেষ চেষ্টা। একটু দূরে দাঁড়িয়ে কাটা ধানের আঁটি বেঁধে দিচ্ছিলেন কৃষক রইছ মিয়া। চোখের কোণে জমে থাকা পানি আর বৃষ্টির পানির পার্থক্য বোঝা যাচ্ছিল না। প্রশ্ন করতেই গলা ধরে এলো তাঁর। কান্না কারতে করতে বলেন, ধানের ওপরে তিন-চার হাত পানি। কীভাবে কাটমু? যা ছিল, সব ভেসে গেল। চোখের সামনে তলিয়ে গেল সোনার ধান। ধানই আমাদের জীবন। আর সেই জীবনটাই এখন পানির নিচে ডুবে আছে। আমরা নিঃস্ব হয়ে গেলাম।এই চিত্র এখন নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। টানা বর্ষণে দেশের হাওরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। যারা জমি থেকে ফসল কাটতে পেরেছেন, তাদের ধানও মাঠে ভিজছে। রোদ না থাকায় শুকিয়ে গোলায় তুলতে পারছেন না কৃষক।

এ অবস্থায় বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে কৃষক অসহায় হয়ে পড়েছেন। তারা বলছেন, শুধু বৃষ্টির পানি নয়, নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় এ অবস্থা দাঁড়িয়েছে। আরও দুয়েক দিন গেলে এই পাকা ধানে পচন ধরবে। বুকের দরদ ঢেলে যে চাষি ফসল ফলিয়েছেন, সে চাষির মাথায় এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।মাঠে মাঠে যখন কৃষকের এমন আর্তনাদ, তখন গতকাল বুধবার বিকেলে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সতর্কবার্তার তথ্য বলছে, নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারে বন্যা চলছে। এ দুই জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে এবং অবনতিও হতে পারে। একই সঙ্গে আরেও তিন জেলা হবিগঞ্জ, সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যার সতর্কতার কথা জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্যের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, এই অঞ্চলে আগামী তিন দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে।এরই মধ্যে হাওরাঞ্চলে ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল সংসদ অধিবেশনে একটি সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে এ কথা জানান তিনি। এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী জানান, তিন দিন আগে আবহাওয়া প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তিনটি জেলার স্থানীয় প্রশাসনকে পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টি হলে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

ডুবল ১৯৯ হাওর

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ এপ্রিল থেকে মেঘালয় চেরাপুঞ্জিতে হওয়া বৃষ্টির পানির ঢলে সুনামগঞ্জে পাহাড়ি নদীসহ ছোট-বড় ৯৭ নদীতে পানি বেড়েছে। অন্যদিকে দেশের ভেতরে হওয়া ভারী বর্ষণে এবং অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে জলাবদ্ধতায় পড়েছে ১৯৯টি ছোট-বড় হাওর।জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বললেন, বাঁধ ভেঙেছে দুটি। এগুলো হচ্ছে মধ্যনগরের এরন বিল এবং একই উপজেলার জিনারিয়া বাঁধ। এই বাঁধগুলো বড় হাওরের না হলেও এসব বাঁধ ভেঙে তিনটি ছোট হাওরে পানি ঢুকেছে। জলাবদ্ধতার পানিতে ডুবেছে ৯ হাজার ৪৯ হেক্টর জমি, সব মিলিয়ে পানিতে ডুবে বুধবার বিকেল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ৫০ হাজার টন ধানের ক্ষতি হয়েছে। টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কেটি টাকা। তবে কৃষকদের দেওয়া তথ্যমতে, এই ক্ষতি আরও অনেক বেশি।বর্গা চাষিদের সংকট আরও গভীর। নিজের জমি নয়, কিন্তু দায় পুরোপুরি তাদের। ফসল না হলে ঋণ, মালিকের পাওনা, সংসারের খরচ সব একসঙ্গে এসে চেপে বসে। সুনামগঞ্জের গুয়াছুড়ার বর্গাচাষি কমর আলী বলেন, বারো আনা জমি ডুইবা গেছে। ৭০ হাজার টেকা খরচ কইরা চাষ করলাম। মালিকরে ধান দিমু কেমনে? পোলা-মাইয়া লইয়া কিলা বাঁচতাম?

দেখার হাওরের বর্গা চাষি কে এম ফখরুল ইসলাম বললেন, এখানে ৭০ শতাংশের বেশি কৃষক কিরাজ (বর্গাচাষ) করে। ঝুঁকি এত বেশি হয়ে গেছে যে, এখন সবাই এই পদ্ধতিতেই করছে। কিন্তু ফসল না হলে কৃষক পুরোপুরি ডুবে যায়।তাহিরপুর উপজেলার শাহাগঞ্জ গ্রামের কৃষক জিয়াউর রহমান বলেন, শনির হাওরের অর্ধেকের বেশি ধান এখনও বাকি। ২০-২২ কিয়ারের মধ্যে মাত্র আট কিয়ার কাটতে পেরেছি। রোদ না থাকায় শুকাতে পারছি না, আর হাঁটু-উরু পানি থাকায় ক্ষেতেও নামা কঠিন।সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, হাওরে পানি বাড়ছে। বৃষ্টির কারণে কৃষকরা মাড়াই করা ধানও শুকাতে পারছেন না। নানা দিক থেকে কৃষকরা সংকটে আছেন।