NEWSTV24
Bab al-Mandab Strait বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে চোখ ইরান ও মিত্রদের
বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬ ১৮:২৩ অপরাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

লেবাননে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান সামরিক অভিযানের জেরে এবার ইরান ও এর আঞ্চলিক মিত্ররা লোহিত সাগরের এই প্রণালীসহ ‘অন্যান্য ফ্রন্ট সক্রিয় করার’ কথা ভাবছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর এবং লেবাননে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করায় পশ্চিম এশিয়ার রণক্ষেত্রে নজর এখন আরেকটি কৌশলগত সমুদ্রপথের দিকে ঘুরে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই অঞ্চলের চলমান সংকটে পরবর্তী বড় উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালী।
মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলোতে একটি খবর চাউর হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, লেবাননে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান সামরিক অভিযানের জেরে ইরান ও এর আঞ্চলিক মিত্ররা লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশদ্বারে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালীসহ ‘অন্যান্য ফ্রন্ট সক্রিয় করার’ বিষয়টি বিবেচনা করছে।
সোমবার লেবাননে ইসরাইলের অভিযানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ শান্তি আলোচনা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ইরান। এর পরপরই তেহরানের পক্ষ থেকে বাব আল-মান্দেব নিয়ে ওই খবর সামনে এল।

ইরানের প্রেস টিভির খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার ইরানের সামরিক বাহিনীর কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কানিও এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছেন, গাজা এবং লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক অভিযান বন্ধ না-হলে বাব আল-মান্দেব প্রণালীতেও হরমুজের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় থাকা ইসরাইল যদি লেবানন এবং গাজায় হামলা বন্ধ না করে, তবে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ উভয় যুদ্ধক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নেবে। বাব আল-মান্দেব প্রণালীও হরমুজের মতোই নিয়ন্ত্রণ করা হবে।” ইরানের কর্মকর্তারা অবশ্য বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধের কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও দেননি। তবে ইরানের গণমাধ্যমের খবরে এই প্রণালী নিয়ে যে হুমকির আভাস মিলছে, সেটিই বিশ্ব বাজারকে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কারণ, এর আগেই হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বাজার এমনিতেই অস্থিতিশীল হয়ে রয়েছে, যে পথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ করা হয়।


হরমুজ প্রণালীর বাইরেও এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনীকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে, বিনিয়োগকারীদের এমন আশঙ্কায় সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে গেছে। তেহরানের আগের কিছু সতর্কবার্তার কারণে এই উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত মাসে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছিল, নতুন কোনো সংঘাত শুরু হলে তা ‘এই অঞ্চলের বাইরেও’ ছড়িয়ে পড়বে। অন্যদিকে, ইরানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, কূটনীতি ব্যর্থ হলে তারা ‘নতুন যুদ্ধক্ষেত্র’ এবং ‘নতুন হাতিয়ার’ ব্যবহার করবেন।
বাব আল-মান্দেব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক জলপথ। এর এক দিকে রয়েছে ইয়েমেন। অন্য দিকে রয়েছে আফ্রিকা মহাদেশের জিবুতি এবং ইরিত্রিয়া। দিনে প্রায় ৮৮ লক্ষ ব্যারেল খনিজ তেল পরিবহণ হয় বাব আল-মান্দেবের করিডর দিয়ে। পাশাপাশি, ওই পথে চলাচল করে বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০-১২ শতাংশ পণ্য। ২০২৩ সালের শেষের দিকে, গাজা যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুতিরা এই প্রণালী এবং এর আশেপাশের জলসীমায় চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে একের পর এক হামলা চালিয়েছিল।


হুতিদের সেই হামলার কারণে অনেক শিপিং কোম্পানি তাদের জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে ঘুরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এতে যাত্রাপথ হাজার হাজার কিলোমিটার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পায় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ে। সিএনএন-এর তথ্য অনুযায়ী, সেই অচলাবস্থার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বছরে শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছিল এবং নৌ-পরিবহন ও বিমা খরচ আকাশচুম্বী হয়েছিল। চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যেও বাব আল-মান্দেব প্রণালী এখন পর্যন্ত অনেকটাই উন্মুক্ত ও সচল রয়েছে, যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি রুট এবং সুয়েজ খালে প্রবেশের একমাত্র পথ ধরে রেখেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের প্রথাগত সামরিক ক্ষমতার মধ্যে নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহ এবং প্রধান বাণিজ্য পথগুলোকে বিপর্যস্ত করার ক্ষমতার মধ্যে নিহিত। চলতি বছরের শুরুতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর, তেহরান হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে অধিকাংশ বাণিজ্যিক কার্যক্রম কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে, চরম উত্তেজনার মুহূর্তে এই কৌশলগত জলপথগুলোকে তারা চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দ্বিধা করবে না। সূত্র : গালফ নিউজ।