‘বিচারের বাণী যখন দীর্ঘ নিঃশ্বাসে কাঁদে, তখন মানুষের আয়ুও সেই বিলম্বিত বিচারের সমাপ্তি দেখে যেতে পারে না।’ ঠিক এই নির্মম সত্যটিই আজ আরও একবার প্রকাশ পেল ভারতের কেরালার এরনাকুলামে। ২০০৬ সালের ১১ জুলাই মুম্বাইয়ের লোকাল ট্রেনে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ধারাবাহিক বোমা বিস্ফোরণ (৭/১১ মামলা) সংক্রান্ত তথাকথিত 'সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ'-এর ২০ বছর পূর্তিতে সমবেত হয়েছিলেন এই মামলায় দীর্ঘ প্রায় দুই দশক কারাভোগের পর নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া মুসলিম ব্যক্তিরা। সলিডারিটি ইয়ুথ মুভমেন্টের উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে উঠে এসেছে ভারতীয় পুলিশ, তদন্তকারী সংস্থা ও বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘ ২০ বছরের ব্যর্থতা, চরম অবিচার এবং মিথ্যা মামলার অন্ধকার দিকগুলো।
২০০৬ সালের সেই ভয়াবহ ঘটনার পর সম্পূর্ণ জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তৎকালীন অ্যান্টি-টেকনিক্যাল বা অ্যান্টি-টেররিজম স্কোয়াড (এটিএস) একদল মুসলিম যুবকদের গ্রেফতার করে। মামলার অন্যতম খালাসপ্রাপ্ত এবং 'ইনোসেন্স নেটওয়ার্ক অব ইন্ডিয়া'-এর কর্মী আব্দুল ওয়াহিদ শেখ জানান, শুরুতে তাদের বলা হয়েছিল যে আসল অপরাধী ধরা পড়লেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু পরবর্তীতে সাজানো প্রমাণ ও জোরপূর্বক আদায়কৃত স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে ২০১৫ সালে ট্রায়াল কোর্ট ৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৭ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
কারাগারের সেই দিনগুলোর ভয়াবহ স্মৃতি হাতড়ে ওয়াহিদ শেখ বলেন, "পুলিশ যখন আমাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাত, তখন সেই চিৎকার শোনার কেউ ছিল না। মার খেতে খেতে আমি মনে মনে ভাবতাম, ভারতীয় সংবিধানে এভাবে মারধর করা তো অপরাধ; নিশ্চয়ই আইন আমাদের একদিন এই অবিচারের হাত থেকে বাঁচাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের আইন পুলিশের লাঠি থামানোর ক্ষমতা রাখে না।"
২০২৫ সালের জুলাই মাসে বোম্বে হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট করে দেয় যে, অভিযুক্তদের কাছ থেকে নির্যাতন করে এবং হুবহু একই বয়ান কপি করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্ট পুরো মামলাটিকে ভিত্তিহীন এবং বানোয়াট বলে রায় দিয়ে ১২ জনকেই বেকসুর খালাস দেয়। কিন্তু ততদিনে তাদের জীবনের সোনালী ১৯টি বছর অন্ধ কুঠুরিতে হারিয়ে গেছে।
বিচার যখন মানুষের আয়ুর চেয়ে দীর্ঘ হয় বোম্বে হাইকোর্টের খালাসের রায়ের পর অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। তবে সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মহারাষ্ট্র সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করায় এখনও তাদের মাথার ওপর আশঙ্কার তলোয়ার ঝুলছে।
বন্দিদের একজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ট্রায়াল কোর্টে লেগেছে ৯ বছর, হাইকোর্টে ১০ বছর এবং সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় আসতে হয়তো আরও ২০ বছর লাগবে। ততদিনে আমাদের কেউ বেঁচে থাকবে কিনা সন্দেহ। যদি একটি মিথ্যা মামলা থেকে মুক্তি পেতে মানুষের পুরো জীবনটাই শেষ হয়ে যায়, তবে সেই বিচারের কোনো মূল্য থাকে না। মামলার অন্যতম অভিযুক্ত কামাল আনসারি তো কারাগারেই মারা গেছেন, নিজের নির্দোষ হওয়ার চূড়ান্ত রায় দেখে যেতে পারেননি। তার বিধবা স্ত্রী ও ছয় সন্তান আজ চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
দীর্ঘ ১৯ বছর পর কারাগার থেকে মুক্ত হলেও এই সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ সহজ করেনি। কোনো সরকারি সাহায্য বা ক্ষতিপূরণ মেলেনি। সমাজ বা বড় কোনো সংগঠন তাদের কর্মসংস্থানের জন্য এগিয়ে আসেনি। কেবল কিছু মুসলিম দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং 'মাইলস টু স্মাইল'-এর মতো মানবিক সংগঠন তাদের ক্ষুদ্র ব্যবসা বা জীবিকা নির্বাহের জন্য অর্থায়নের আশ্বাস দিয়েছে।
আজও এই মামলা নিয়ে ভারতের পুলিশ বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কোনো প্রকাশ্য আলোচনা করতে চান না। সম্প্রতি মুম্বাইয়ের পুলিশ কমিশনার দেবেন ভারতীর সাথে ওয়াহিদ শেখের দেখা হলে, তিনি এই মামলা প্রসঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান এবং আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নেন। ওয়াহিদ শেখের মতে, এই নীরবতাই প্রমাণ করে যে তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তারা নিজেদের গুরুতর ভুল এবং অন্যায় সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন।
নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া সোহেল শেখ কিংবা সাজিদদের মতো মানুষেরা এখন তাদের বাকি জীবনটুকু পরিবার ও সন্তানদের সাথে সামান্য আনন্দের খোঁজে পার করতে চান। কিন্তু যে তরুণ বয়স এবং আনন্দ তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা কি কোনোদিন ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নটিই আজ ভারতের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার দিকে এক বিরাট আঙুল তুলছে।