শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। একই সঙ্গে নতুন বিধিমালার আওতায় শব্দদূষণ রোধে পুলিশের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। এখন থেকে নির্ধারিত মাত্রার বেশি শব্দ সৃষ্টি করে এমন হর্ন ব্যবহার করলে বা শব্দদূষণের বিধি লঙ্ঘন করলে সার্জেন্ট বা এর ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলেই সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করতে পারবেন। জরিমানা পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট মোটরযানও আটক করা যাবে।পরিবেশ অধিদপ্তর গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালার বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান আরও জোরদার করার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।বর্তমানে কার্যকর বিধিমালা অনুযায়ী শব্দদূষণের অপরাধে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে নতুন বিধিমালার খসড়ায় এই শাস্তি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিধিমালায় এলাকাভেদে শব্দের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে। নীরব এলাকায় দিনের বেলায় সর্বোচ্চ ৫০ ডেসিবেল এবং রাতে ৪০ ডেসিবেল শব্দ অনুমোদিত। আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ও রাতে ৪৫ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০ ও রাতে ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ও রাতে ৬০ ডেসিবেল এবং শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ও রাতে ৭০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দের অনুমতি রয়েছে।বিধিমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত মাত্রার বেশি শব্দ সৃষ্টি করে এমন কোনো হর্ন উৎপাদন, আমদানি, মজুত, বিক্রি, বাজারজাত, পরিবহন বা ব্যবহার করা যাবে না। নীরব এলাকায় কোনো ধরনের হর্ন বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত হর্ন বাজানো যাবে না। একই সঙ্গে পটকা, আতশবাজি এবং শব্দদূষণ সৃষ্টি করে এমন অন্যান্য কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পারিবারিক অনুষ্ঠান, সামাজিক আয়োজন বা জনসমাবেশে কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া মাইক, লাউডস্পিকার, সাউন্ড সিস্টেম বা অন্যান্য উচ্চ শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। অনুমতি থাকলেও শব্দের মাত্রা ৯০ ডেসিবেলের বেশি এবং ব্যবহারের সময় পাঁচ ঘণ্টার বেশি হতে পারবে না। রাত ১১টার পর এসব যন্ত্র ব্যবহারও নিষিদ্ধ।আবাসিক এলাকা ও এর ৫০০ মিটারের মধ্যে সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত ইট ও পাথর ভাঙার যন্ত্র, পাইলিং মেশিন, কংক্রিট মিক্সারসহ উচ্চ শব্দ উৎপাদনকারী ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাবে না। প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলেও উচ্চ শব্দ সৃষ্টি করে এমন যন্ত্র ব্যবহার এবং পটকা বা আতশবাজি ফোটানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালার আওতায় এখন শব্দদূষণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি টেলিফোন, লিখিত আবেদন, ইমেইল বা মৌখিকভাবে অভিযোগ করতে পারবেন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ শব্দদূষণকারী যন্ত্রপাতি জব্দ করতে পারবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, নতুন বিধিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সরাসরি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনারসহ প্রায় ১০০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে এবং তাদের হাতে শব্দের মাত্রা পরিমাপের যন্ত্র (সাউন্ড লেভেল ডিটেক্টর) দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আইনটির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাগেলে নগরবাসী শব্দদূষণের দুর্ভোগ থেকে অনেকটাই মুক্তি পাবেন।বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, এতদিন আইন থাকলেও প্রয়োগ ছিল সীমিত। পরিবেশ অধিদপ্তরের জনবল সংকটের কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন ছিল। পুলিশের হাতে ক্ষমতা দেওয়ায় আইন প্রয়োগের সুযোগ বেড়েছে। তবে একই সঙ্গে হাইড্রোলিক ও উচ্চ শব্দের হর্নের আমদানি, বিপণন ও ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারি এবং পরিবহন খাতে চালকদের সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।