NEWSTV24
নেপালে এত বড় বিপর্যয়ের পেছনে ঠিক কী ঘটেছিল
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬ ০৯:০৩ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

উজানে তুষারধস ও নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে হড়পা বান, নাকি হিমবাহ হ্রদ ভেঙে বন্যা কারণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে ভোতে কোশি নদীতে বুধবার সকালে হঠাৎ নেমে আসে প্রবল স্রোতের হড়পা বান। মুহূর্তের মধ্যে নদীর পানি ফুলে-ফেঁপে উঠে ভাসিয়ে নেয় সেতু, সড়ক ও বসতি। এর সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় ভূমিধসও ঘটে। নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত ১৫৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত ৪০৩ জন, যাদের বড় একটি অংশ বিদেশি পর্যটক বলে জানা গেছে।তবে এত বড় বিপর্যয়ের পেছনে ঠিক কী ঘটেছিল, তার উত্তর এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। প্রাথমিক অনুসন্ধান ও স্যাটেলাইটের কিছু তথ্য বলছে, নেপাল-চীন সীমান্তের দুর্গম পার্বত্য এলাকায় তুষার ও পাথরের বিশাল ধসের কারণে লহেন্দে নদীর গতিপথ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পরে জমে থাকা পানির চাপে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে হঠাৎ নিচের দিকে প্রবল জলস্রোত নেমে আসে। সেটিই ভোতে কোশি নদীতে ভয়াবহ হড়পা বানের সৃষ্টি করে থাকতে পারে।তবে আরেকটি আশঙ্কাও এখনো উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কোনো হিমবাহের হ্রদ ভেঙে আকস্মিক পানি নেমে এসেছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছেন বিজ্ঞানীরা। পরিষ্কার স্যাটেলাইট ছবি এবং একাধিক উৎসের তথ্য যাচাই না হওয়া পর্যন্ত বন্যার প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

ভূমিকম্প নয়, বরফ-পাথরের ধস?

ঘটনার পরপরই তিব্বত এলাকায় ভূমিকম্প হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল। পরে পাওয়া তথ্য বলছে, প্রথমে যে কম্পন অনুভূত হয়েছিল, সেটি বড় ধরনের বরফ ও পাথরের ভূমিধসের কারণেও হতে পারে।কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের (আইসিআইএমওডি) রিমোট সেন্সিং ও জিও ইনফরমেশন বিশ্লেষক সার্থক শ্রেষ্ঠ জানান, চীন সীমান্তের দিকে প্রাথমিক মূল্যায়নে অস্বাভাবিক কোনো বিষয় ধরা পড়েনি। তাদের ধারণা, নেপালের অংশে একটি পাথুরে বরফধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে লহেন্দে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে একের পর এক তীব্র বন্যা সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র শান্তি মহাতও জানিয়েছেন, একটি তুষারধসের কারণে নদীর গতিপথ আটকে যাওয়ার প্রাথমিক তথ্য তারা পেয়েছেন। আইসিআইএমওডি চীনের বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য নিয়ে তাদের সঙ্গে তা শেয়ার করেছে।তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি এখনো প্রাথমিক মূল্যায়ন। কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি। এই মুহূর্তে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরে বন্যার প্রকৃত কারণ আরও পরিষ্কার হবে।

কীভাবে হড়পা বান হলো
বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ব্যাখ্যা হলো, উঁচু পাহাড় থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল একটি অংশ ধসে লহেন্দে নদীর ওপর পড়ে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পানি জমতে থাকে। পাহাড়ি এলাকায় এমন প্রাকৃতিক বাধা বা অস্থায়ী বাঁধ দীর্ঘ সময় টিকে থাকে না।একপর্যায়ে জমে থাকা পানির চাপ বেড়ে গেলে সেই বাধা ভেঙে যায়। তখন অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি, পাথর, বরফ ও পলিমাটি নিচের দিকে ধেয়ে আসে। এই প্রবল স্রোতই ভোতে কোশি নদীতে হড়পা বানের সৃষ্টি করে।কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও জলবায়ু গবেষক রিজান ভক্ত কায়স্থ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, নেপাল ও চীনের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনা এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তুষারধসের এই ধারণা করা হচ্ছে। তার মতে, নেপালের দিক থেকে তুষারধস নেমে লহেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দিয়েছিল। পরে জমে থাকা পানি প্রবল স্রোতে বেরিয়ে এসে ভোতে কোশীতে বিপর্যয় ঘটায়।


ভূমিকম্পের তথ্যও মিলেছে
তুষারধসের আশঙ্কার পাশাপাশি ওই এলাকায় ভূমিকম্পের তথ্যও পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তিব্বত এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। এর কেন্দ্র ছিল গোসাইকুণ্ড হ্রদ থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।তবে এই ভূমিকম্পই বন্যার কারণ ছিল কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং ভূমিকম্পের কম্পনের সঙ্গে বরফ-পাথরের বড় ধরনের ধসের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও বিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখছেন।

হিমবাহের হ্রদ ভেঙেছিল কী
বন্যার আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হলো হিমবাহের হ্রদ ভেঙে যাওয়া। হিমবাহ গলে পাহাড়ের কোলে বড় হ্রদ তৈরি হলে সেটিকে হিমবাহ হ্রদ বলা হয়। এই ধরনের হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে আসে। পাহাড়ি নদীতে তখন ভয়াবহ হড়পা বান তৈরি হতে পারে।এবারের ঘটনাতেও এমন কোনো হিমবাহ হ্রদ ভেঙেছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, নেপাল বা তিব্বতের কোথাও কোনো হিমবাহের হ্রদ ভেঙে থাকতে পারে।তবে কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কায়স্থ বলছেন, ওই এলাকায় অতীতে এমন ঘটনা ঘটেছে। গত বছরও একই এলাকায় হিমবাহের হ্রদ ভেঙে ভোতে কোশি নদীতে আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ৮ জুলাই নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে লহেন্দে নদীর একটি হিমবাহ হ্রদ ভেঙে আকস্মিক জলস্রোত নেমে এসেছিল বলে তখন নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছিল। সেন্টিনেল স্যাটেলাইটের ছবির বিশ্লেষণেও একই তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।

এবার ভারী বৃষ্টি বড় কারণ নয়
এবারের বন্যাকে শুধু অতিবৃষ্টির ফল হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। কারণ, বন্যার আগে রাসুয়া এলাকায় উল্লেখযোগ্য ভারী বৃষ্টির তথ্য নেই।অধ্যাপক কায়স্থের মতে, পানি যেভাবে হঠাৎ প্রবল স্রোতে নিচের দিকে নেমে এসেছে, তাতে উজানে কোথাও পানি আটকে যাওয়ার পর একসঙ্গে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনাই বেশি। অর্থাৎ তুষারধস, ভূমিধস কিংবা হিমবাহ হ্রদ ভেঙে যাওয়ার মতো কোনো আকস্মিক ঘটনা এর পেছনে থাকতে পারে।

কেন বারবার এমন বিপর্যয়?
হিমালয় এখন জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহ দ্রুত গলছে। এতে নতুন নতুন হিমবাহ হ্রদ তৈরি হচ্ছে এবং পুরোনো হ্রদগুলোর পানির পরিমাণও বাড়ছে। একই সঙ্গে পাহাড়ের বরফ ও মাটির স্থিতিশীলতাও কমে যাচ্ছে।আইসিআইএমওডির জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং সতর্ক করেছেন, উজানে এখনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে থাকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, যেকোনো সময় দ্বিতীয় দফায় বন্যা দেখা দিতে পারে।এ কারণেই এবারের ঘটনা শুধু একটি আকস্মিক পাহাড়ি বন্যা নয়; এটি হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশেরও একটি সতর্কবার্তা।২০১৯ সালের একটি গবেষণাতেও বলা হয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের হিমবাহগুলো দ্রুত বরফ হারাচ্ছে। এর ফলে তুষারধস, হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।