NEWSTV24
পাঁচ বিভাগ ও সীমান্তবর্তী আসনে গুরুত্ব জামায়াতের
শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬ ১৬:৪৬ অপরাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নির্ধারণে দেশের উত্তরাঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। ভোট সামনে রেখে ১০ দল মিলে জোট করলেও শরিক দলগুলোতে এই অঞ্চলের আসনে খুব কম ছাড় দিয়েছে। রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে মাত্র চারটি ছেড়েছে শরিকদের। আর রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি আসনের মধ্যে শরিকদের জন্য ছেড়েছে তিনটি। আরও একটি বিভাগে আসন বণ্টনে জামায়াত ছাড় দেয়নি বললেই চলে। সেটি হলো খুলনা। এ বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে ৩৫টিই নিজেদের প্রার্থীর জন্য রেখেছে।এর পরে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগকে গুরুত্ব দিয়েছে জামায়াত। চট্টগ্রাম বিভাগের ৫৮টি আসনের মধ্যে জামায়াত রেখেছে ৩৩টি। এর মধ্যে আবার দক্ষিণ চট্টগ্রামের আসনগুলোতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে দলটি। দক্ষিণ চট্টগ্রামের ১০টি আসনের সব ক টিই নিজেদের প্রার্থীদের জন্য রেখেছে। সিলেটে ১৯টির মধ্যে জামায়াত ১০টি নিজেদের প্রার্থীদের দিয়েছে।এর পাশাপাশি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সীমান্তবর্তী এলাকার আসনগুলোকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। যেমন রংপুর বিভাগের ১৭টি ভারত সীমান্তবর্তী আসনের মধ্যে ১৪টি নিজেদের হাতে রেখেছে। রাজশাহী, খুলনা, সিলেটের চিত্রও একই রকম।তবে ময়মনসিংহ, ঢাকা ও বরিশাল বিভাগের অধিকাংশ আসনে শরিকদের ছাড় দিচ্ছে জামায়াত। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে উত্তর চট্টগ্রাম, বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালীতেও প্রায় অর্ধেক আসন ছাড়ছে।

শরিকদের ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোর তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, ৮-১০টি বাদে বাকিগুলোতে অতীতে জামায়াতের শক্ত অবস্থান ছিল না। জামায়াত নেতাদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় তাদের জোট এখন বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। জামায়াত, শরিক দল, দোদুল্যমান এবং বিএনপিবিরোধী ভোট যোগ করলে সারাদেশে সংখ্যাটি বেশ বড়। ফলে শরিকদের দুর্বল আসন ছাড়া হয়নি।জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, দাঁড়িপাল্লা এখন শক্তিশালী প্রতীক। এনসিপির শাপলা কলিও তাই। ১৫ বছরের লড়াই-সংগ্রাম এবং ৫ আগস্ট-পরবর্তী ইতিবাচক ভূমিকার কারণে জামায়াত এখন বড় দল। সব আসনেই জামায়াত শক্তিশালী। তাই শরিকদের যেসব আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো দুর্বল নয়।জামায়াত কেন উত্তরবঙ্গ ও খুলনার ১০৮ আসনে বেশি জোর দিচ্ছে এমন প্রশ্নে আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, আমি নিজে কুমিল্লায় নির্বাচন করছি। জামায়াত আমির ঢাকায় নির্বাচন করছেন। এসব এলাকায়ও অবস্থান দুর্বল নয়। তবে প্রত্যেক দলেরই নিজস্ব শক্তির জায়গা থাকে। উত্তরবঙ্গ এবং খুলনা বিভাগ জামায়াতের শক্তির জায়গা।

জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ ১১ দল নির্বাচনী ঐক্য করেছিল। গত বৃহস্পতিবার ২৫০ আসনে সমঝোতা ঘোষণা করা হয়। ইসলামী আন্দোলনের জন্য ৪৪টি আসন রাখা হয়। তবে নানা অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে ইসলামী আন্দোলন জোট ত্যাগ করেছে।বৃহস্পতিবার ঘোষিত সমঝোতা অনুযায়ী, জামায়াত ১৭৯ আসনে নির্বাচন করবে। তবে ইসলামী আন্দোলনের যে ৫টি উন্মুক্ত আসন রাখা হয়েছিল, এর চারটিতে থাকবে জামায়াতের প্রার্থী। ফলে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮৩। ইসলামী আন্দোলনের জন্য রাখা ৪৪ আসনেও জামায়াত নির্বাচন করলে ২২৭ আসনে দলটির প্রার্থী থাকবেন। তবে কয়েকটি আসন এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ছাড়ার প্রতিশ্রুতি থাকায় শেষ পর্যন্ত জামায়াত অন্তত ২২০ আসনে নির্বাচন করবে বলে দলটির সূত্র জানিয়েছে।জামায়াত ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ১২ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮ আসন পেয়েছিল। যা দলটির সর্বোচ্চ নির্বাচনী সাফল্য। ২০০১ সালে বিএনপির জোট শরিক হয়ে ১৭ আসন পেয়েছিল। এর সাতটি পেয়েছিল রংপুর থেকে। অন্যান্য বিভাগে আসন পেলেও, ৯১ সালে রাজবাড়ী জেলায় একটি আসন ছাড়া কখনও ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে জামায়াত জয়ী হতে পারেনি। জরিপ কী বলছে ২০১৪ সালে উপজেলা নির্বাচনে এককভাবে অংশ নিয়ে প্রথম দুই পর্বে ৩০ উপজেলায় জয়ী হয়েছিল জামায়াত। যার অধিকাংশ ছিল রংপুর বিভাগের। পরের তিন ধাপে আরও ছয় উপজেলায় জয়ী হয় জামায়াত। তবে, সেবার উপজেলা নির্বাচনের তৃতীয় পর্ব থেকেই কারচুপি-জালিয়াতির খবর আসতে থাকে। পরবর্তী বছরগুলোর নির্বাচনও বিতর্কিত। ফলে বিশ্লেষণের জন্য প্রকৃত তথ্য নেই।

জামায়াত দলীয়ভাবে যে তিনটি জরিপ করেছে, তাতে দাবি করা হয়েছে, রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনে অন্তত ২৫টিতে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীরা জয়ী হবেন। রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় ৩৯টি আসনের ১৮টিতে জয় আশা করছে জামায়াত।খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের ২৪টিতে দাঁড়িপাল্লা এগিয়ে রয়েছে বলে জামায়াত সূত্র জানিয়েছে। তাদের হিসাবে, সিলেট বিভাগের ১৯ আসনের ১০টি, বরিশালের ২১ আসনে চারটি, চট্টগ্রাম বিভাগের ৫৮ আসনে ২৩টিতে জামায়াতের অবস্থান ভালো। ঢাকা বিভাগের ৭০ আসনের মাত্র চারটি এবং ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪ আসনের তিনটিতে জামায়াত এগিয়ে রয়েছে বলে দলীয় জরিপের হিসাব অনুযায়ী।ব্রেইন, ইনোভেশন, ন্যারেটিভসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে জরিপেও জামায়াত রংপুর ও খুলনা বিভাগে এগিয়ে রয়েছে বিএনপির চেয়ে। রাজশাহী বিভাগে অবস্থান প্রায় সমানে সমানে। প্রথম দুটি প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল ও চট্টগ্রামে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে বিএনপি। তবে এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটসের জরিপ অনুযায়ী, বিএনপির জনসমর্থন ৭০ শতাংশ। সবল এলাকায় নিজে লড়বে জামায়াত ইসলামী আন্দোলনসহ আটদলীয় জোট গঠনের সময় জামায়াত জানিয়ে দিয়েছিল, রংপুর বিভাগে আসন ছাড়বে না। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বের গড়া এনসিপি জোটে আসার পর জামায়াত এ নীতিতে পরিবর্তন আনে। ইসলামী আন্দোলন এবং এনসিপিকে সাতটি আসন ছেড়েছিল। ইসলামী আন্দোলন জোট ছাড়ার পর জামায়াত একাই ২৯ আসনে নির্বাচন করবে।এনসিপিকে পঞ্চগড়-১, দিনাজপুর-৫, কুড়িগ্রাম-২ এবং রংপুর-৪ আসন ছেড়েছে জামায়াত। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ বাকি আট শরিক দলকে রংপুর বিভাগে একটিও আসন ছাড়েনি দাঁড়িপাল্লা।

রাজশাহী বিভাগের ৩৯ আসনের মধ্যে নাটোর-৩ এবং সিরাজগঞ্জ-৬ আসন এনসিপিকে ছেড়েছে জামায়াত। ইসলামী আন্দোলনকে ছেড়েছিল একটি। দলটি জোট ছাড়ার পর এই আসনেও জামায়াত নির্বাচন করবে। বাংলাদেশ খেলাফতকে সিরাজগঞ্জ-৩ আসন ছেড়ে জামায়াত। এ হিসাবে রাজশাহীতে ৩৬ আসনে নির্বাচন করবে জামায়াত।খুলনায় বিভাগে ইসলামী আন্দোলনকে চারটি আসন ছেড়েছিল জামায়াত। চরমোনাই পীরের দলের জন্য উন্মুক্ত রেখেছিল খুলনা-৩। চুয়াডাঙ্গা-১ আসন বণ্টন বাকি রয়েছে। এ আসনটি এনসিপি চায়। ইসলামী আন্দোলন জোট ত্যাগ করার পর খুলনা বিভাগের ৩৫টি আসনেই জামায়াতের নির্বাচন করা প্রায় নিশ্চিত।দক্ষিণ চট্টগ্রামের ১০টি আসনের সবগুলোতেই লড়বে জামায়াত। বৃহত্তর নোয়াখালীর ১৪ আসনের অর্ধেকে এবং বৃহত্তর কুমিল্লার ২২ আসনের ১৩টিতে নির্বাচন করবেন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীরা। ইসলামী আন্দোলন জোট ত্যাগ করায় এসব এলাকায় জামায়াতের প্রার্থী আরও বৃদ্ধি পাবে। মধ্যাঞ্চলে শরিকরা ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের ৯৪ আসনের ৪২টি নিজের ভাগে রেখেছিল জামায়াত। ৫২টি আসন শরিকদের ছেড়েছিল। এনসিপিকে দেওয়া আসনের মধ্যে ১২টি এ দুই বিভাগের। বাংলাদেশ খেলাফতকে জামায়াত যে ২০টি আসন ছাড়তে যাচ্ছে, সেগুলোর ১১টি ঢাকা এবং ময়মনসিংহ বিভাগের। খেলাফত মজলিসকে একটি এবং এলডিপিকে দুটি আসন ছাড়া হয়েছে এ দুই বিভাগে।

ইসলামী আন্দোলনকে ঢাকা ও ময়মনসিংহে ১৯টি আসন ছেড়েছিল জামায়াত। দলটি জোট ছাড়ায় এগুলোর কয়েকটি শরিকরা পেতে পারে। বাকিগুলোতে জামায়াত এখন নির্বাচন করতে পারে।বরিশাল বিভাগের ২১ আসনে ছয়টি জামায়াত নির্বাচন করতে চেয়েছিল। ইসলামী আন্দোলনকে ১১টি আসন ছেড়েছিল। এনসিপি, এবি এবং দুই খেলাফতকে এই বিভাগে একটি আসন ছেড়েছিল। ইসলামী আন্দোলন চলে যাওয়ায় যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।সিলেটের ১৯ আসনের ১০টি জামায়াত রেখে বাকিগুলো ইসলামী আন্দোলন এবং দুই খেলাফতকে ছাড়ে। বাসিত আযাদের নেতৃত্বাধীন খেলাফতকে সর্বোচ্চ চারটি আসন ছেড়েছে।