NEWSTV24
শিক্ষাসামগ্রীর দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশ
সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬ ১৪:৫৬ অপরাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

বছর ঘুরতেই বই, খাতা, কলম, পেন্সিল, স্কুল ব্যাগসহ শিক্ষাসামগ্রীর দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। গত বছরের প্রথম দিকে যেসব মাঝারি মানের পেন্সিল ডজন ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার তা কিনতে লাগছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। সাধারণ মানের ৫০০ টাকার একটি স্কুল ব্যাগ কিনতে এবার গুনতে হচ্ছে ৮০০ টাকার ওপরে। বইয়ের দামও পড়ছে আগের চেয়ে বেশি। সন্তানের জন্য শিক্ষাসামগ্রী কিনতে গিয়ে বাড়তি চাপে পড়ছেন অভিভাবকরা। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ঝরে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশিষ্টজন।২০২৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক সমীক্ষায় বলা হয়, শিক্ষা খাতে বাড়তি খরচের কারণে সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে যেতে ঋণ নিতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে। দৈনন্দিন প্রয়োজনও কমাতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ছিল ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। তা বেড়ে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে বেশির ভাগ পরিবার সন্তানদের পড়াশোনা বাদ দিয়ে অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে।

চট্টগ্রামে শিক্ষাসামগ্রী বিক্রির কয়েকটি মার্কেটের একটি চকবাজার মোড়ের শাহেনশাহ মার্কেট। সেখানকার বেশ কয়েকটি দোকানে আধঘণ্টা ধরে ছোটাছুটি করছিলেন মুরাদপুরের বাসিন্দা আহসান সুমন। এক পর্যায়ে কিছু না কিনে মার্কেট থেকে বের হতে দেখা যায় তাঁকে।জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুই ছেলেমেয়ের জন্য দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির বই, খাতা, পেন্সিলসহ কয়েকটি জিনিস কিনতে এসেছিলাম। বেশ কয়েকটি দোকানে গিয়ে দেখি সবকিছুর দামই বাড়তি। ছোট ছোট পাঁচ-ছয়টি বইয়ের দাম চাচ্ছে দুই হাজার টাকা। মাত্র ১২ হাজার টাকা বেতনে দারোয়ানের চাকরি করি। স্ত্রী আট হাজার টাকা বেতনে কাজ করেন একটি কারখানায়। দুজনের সামান্য আয়ে সংসারই চলে না, সেখানে এই বাড়তি খরচে সন্তান পড়ালেখা করানো কঠিন।আন্দরকিল্লা মোড়ে কথা হয় চাকরিজীবী সোনিয়া ইসলামের সঙ্গে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, নতুন বছর অনেকের জন্য স্বস্তির হলেও আমার মতো নিম্ন মধ্যবিত্তদের জন্য অভিশাপ। কারণ, বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে সব শিক্ষাসামগ্রীর। গত বছরের জানুয়ারিতে তৃতীয় শ্রেণির এক সেট বই কিনেছিলাম ৮৫০ টাকায়। এবার একই বইয়ের দাম পড়ছে এক হাজার ৩০০ টাকার ওপরে।

স্কুল ব্যাগের জন্য পরিচিত নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারে কথা হয় ইফতেখার হোসেন রাকিলের সঙ্গে। তিনি বলেন, চতুর্থ শ্রেণির মেয়ের জন্য স্কুল ব্যাগ কিনতে এসে বিপাকে পড়েছি। ৮০০ থেকে এক হাজারের নিচে মাঝারি মানের কোনো ব্যাগই মিলছে না।আরেক অভিভাবক সানজিদা খাতুন বলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই চাল, ডাল, তেলসহ প্রায় সব ভোগ্যপণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে রয়েছে। এর ওপর স্কুল ব্যাগসহ সবকিছুর দামও এবার বেড়েছে। প্লে থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে শুধু ভর্তি ফি বাবদ গুনতে হচ্ছে পাঁচ হাজার টাকার ওপরে। এমন বাড়তি খরচ অনেকের মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণির প্রতিটি বইয়ের দাম বেড়েছে। সামান্য কয়েক পৃষ্ঠার একেকটি বই কিনতে গুনতে হচ্ছে ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা। শিশু শ্রেণির ১০ থেকে ১৫ পৃষ্ঠার একটি বইয়ের দাম পড়ছে ১৮০ থেকে ২২০ টাকা, যা গতবার ছিল ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা। ২০-৩০ পৃষ্ঠার একটি খাতার দাম পড়ছে ৫০ টাকা, যা গতবার ছিল ২০ থেকে ৩০ টাকা। পাঁচ-সাত টাকায় বিক্রি হওয়া প্রতিটি বলপয়েন্ট কলমের দাম পড়ছে ১০ থেকে ১২ টাকা। মানভেদে জ্যামিতি বক্সের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ৩০ টাকা। মাঝারি মানের একটি জ্যামিতি বক্সের দাম পড়ছে ১৬০ থেকে ২০০ টাকা। প্লাস্টিকের ফোল্ডারের দামও প্রতিটিতে বেড়েছে তিন থেকে আট টাকা। ১০ টাকা মূল্যের রাবারের দাম পড়ছে এখন ১৫ টাকার ওপরে। দাম বেড়েছে পরীক্ষার বোর্ড, আর্ট পেপার, শার্পনারসহ প্রায় প্রতিটি সরঞ্জামের।

শাহেনশাহ মার্কেটের নিউ একাডেমিক লাইব্রেরির স্বত্বাধিকারী রাজীব দে বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় সব শিক্ষাসামগ্রীর দাম বেড়েছে। অনেকেই সন্তানের জন্য বই-খাতা কিনতে এসে দাম বাড়তির ক্ষোভ ঝাড়ছে আমাদের ওপর। কিন্তু আমাদের তো কিছুই করার নেই। কারণ, দাম বাড়ান বড় ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন বইয়ে আমাদের ছাড় দেওয়া হয় খুব কম। যে কারণে দাম পড়ে বেশি।মেসার্স মা লাইব্রেরির ব্যবস্থাপক মাহবুব হোসেন বলেন, ছোট সাইজের বই, খাতা থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম এবার বাড়তি। দাম বেড়ে যাওয়ায় সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে এসে বিপাকে পড়তে হচ্ছে অনেককে।জানতে চাইলে রিয়াজউদ্দিন বাজারের তামাকুমন্ডি লেন বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, বছরের ব্যবধানে প্রায় সামগ্রীর দাম বেড়েছে। এতে প্রভাব পড়েছে স্কুল ব্যাগ থেকে শুরু করে সব শিক্ষাসামগ্রীর ওপর। কারণ, একটি ব্যাগ তৈরির জন্য প্রয়োজন হয় কাপড়, চেইন, সুতাসহ অনেক উপকরণ। গতবারের তুলনায় এসব সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যাগের দামের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

আন্দরকিল্লা ব্যবসায়ী সমিতির নেতা মো. মান্নান বলেন, বই, খাতা, কলম, পেন্সিল, জ্যামিতি বক্সসহ এবার প্রায় সবকিছুর দাম বাড়তি। এর বড় কারণ, এসব সামগ্রী তৈরির প্রতিটি উপকরণের দাম গতবারের তুলনায় বেড়েছে।সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম শাখার সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও বেশির ভাগ মানুষের আয় বাড়ছে না। এতে অনেক পরিবার সন্তানদের পড়ালেখা করাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বাড়বে।কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, কয়েক দফা দাম বেড়ে সব ভোগ্যপণ্য এখন ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এতে চাপে পড়েছে মানুষ। নতুন বছরে বেশির ভাগ মানুষের আয় না বাড়লেও ব্যয়ের চাকা ঠিকই ছুটছে। তবে দাম বাড়ার তদারকে নেই প্রশাসনের তোড়জোড়।