NEWSTV24
নতুন সরকারের সামনে তিন চ্যালেঞ্জ
শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৬:৪১ অপরাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো এবং এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, নতুন সরকারের ভিত্তিভূমির সূচনাবিন্দুতে তিনটি বড় বিষয় রয়েছে। এগুলো হচ্ছে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া বিভিন্ন ধরনের কাঠামোগত সমস্যা, অন্তর্বর্তী সরকারের অনিষ্পন্ন সংস্কার এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় অস্বস্তির নীতিহীন বাস্তবতা। এ রকম বাস্তবতায় এখনই জনতুষ্টিবাদী উদ্যোগ না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংযমের পরামর্শও তাঁর।

নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু:

অর্থনৈতিক পর্যালোচনা শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার এসব কথা বলেন তিনি। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে এ আয়োজন করা হয়। রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হবে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যে কোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করে ধৈর্য ধরতে হবে। চলতি অর্থবছরে নতুন কিছু না করে বরং আগামী অর্থবছরের জন্য যথাযথভাবে পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সংযম দেখালে আগামী অর্থবছরে সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু করে অন্যান্য অসুবিধা পরিষ্কারভাবে উতরে যাওয়া সহজ হবে। দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ড. দেবপ্রিয় বলেন, তথ্য-উপাত্ত বলছে, রমজান মাসের প্রয়োজনীয় পণ্যের যথেষ্ট পরিমাণে সরবরাহ রয়েছে। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে রাজনৈতিক প্রভাবাধীন সিন্ডিকেট রয়েছে। নতুন সরকারি দলের নেতারা বলেছেন, তারা সিন্ডিকেট ভেঙে দেবেন। সরকারের প্রথম দিন থেকে আমরা তা দেখার অপেক্ষায় আছি। বিশেষ করে রমজানের প্রাক্কালে এ কথাটার তাৎপর্য খুবই বেশি।

তিনি বলেন, নতুন সরকারের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন হচ্ছে এগুলোকে কোন কৌশলে করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে যে দু-তিনটি মূল লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে, তার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক তাৎপর্য খুবই গভীর। মব সৃষ্টি, জবরদস্তি, ঘুষ নেওয়াসহ হয়রানিমূলক বিভিন্ন অর্থ সংগ্রহ বন্ধ করতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তি পর্যালোচনার সুপারিশ: ড. দেবপ্রিয় বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশের সঙ্গে যেসব জানা-অজানা চুক্তি করেছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। দায়-দেনা পরিস্থিতি ভালো করে পর্যালোচনা করা উচিত। কোনো চুক্তিতে নিয়ম-নীতির ব্যত্যয় ঘটেছে কিনা, যাচাই করা উচিত। তিনি বলেন, বৈদেশিক চুক্তি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হয়নি কিংবা শুধু বন্দর দিয়ে দেওয়ার জন্য হয়নি। আরও অন্যান্য ক্ষেত্রে হয়েছে, যেগুলো হয়তো আমরা অবগত নই। এসব বৈদেশিক চুক্তি খতিয়ে দেখা উচিত।

ঋণ পরিস্থিতি আরও দুর্বল অবস্থায়: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ঋণ ও দায়-দেনা পরিস্থিতি যেভাবে পেয়েছিল, তার চেয়ে আরেকটু খারাপ অবস্থায় রেখে গেছে। এটিই সত্য। এর কারণ হতে পারে রাজস্ব আদায়ের অভাব কিংবা চলতি ব্যয়কে সংকোচন না করতে পারা অথবা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির সামঞ্জস্য বিধান না করা। বাস্তবতা হলো, অন্তর্বর্তী সরকার ঋণ পরিস্থিতি যে অবস্থায় পেয়েছিল, তার চেয়ে আরও দুর্বল ও নাজুক অবস্থায় পেয়েছে বিএনপি সরকার।

উত্তরণকালীন দল গঠনের পরামর্শ: নতুন সরকারকে একটি উত্তরণকালীন দল গঠনের পরামর্শ দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, এই দলের প্রাথমিক কাজ হবে বিগত আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ফরেনসিক রিপোর্ট করে একটি দলিল বা ব্রিফিং ডকুমেন্ট তৈরি করা। তার ভিত্তিতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারবে। আর্থিক খাতে দুর্নীতি বন্ধে আগামী মার্চ মাসের শেষ নাগাদ সরকার যেন জাতীয় সংসদে একটি আর্থিক বিবৃতি দেয় এ পরামর্শ দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে প্রণীত সরকারি আয়-ব্যয় ও বাজেট ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশে আর্থিক বিবৃতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ধারা রয়েছে। এই আর্থিক বিবৃতি সরকারের আর্থিক স্বচ্ছতা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পাহারাদার হবে। রেমিট্যান্সে প্রণোদনা কমানোর সুপারিশ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রেমিট্যান্সের ওপর দেওয়া প্রণোদনা ধীরে ধীরে কমানো উচিত। কারণ রেমিট্যান্সের ওপর প্রণোদনা রাজস্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বছরে যদি ৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে এবং তার ওপর আড়াই শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হয়, তাহলে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। এই অর্থনৈতিক চাপ অবশ্যই আমলে নিতে হবে। মূল প্রবন্ধ মূল প্রবন্ধে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমানে অর্থনীতি বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন সরকার সেই সংকটকালে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এখানে ৩টি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে সমষ্টিগত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দুর্বল পরিস্থিতি এবং সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা। এ বাস্তবতায় কয়েকটি নীতি-সুপারিশ তুলে ধরেন তিনি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে টাকার মান ধীরে ধীরে অবমূল্যায়ন করা এবং রেমিট্যান্স ও রপ্তানির জন্য প্রণোদনা কমিয়ে আনা। তিনি বলেন, সরকারের প্রথম কাজ হবে চলতি অর্থবছরের বাজেট সংশোধন এবং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাঠামো প্রস্তুত করা। এরপর ধীরে ধীরে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত।

পরিচালন ব্যয় মেটাতে ৪ দশকে প্রথম ঋণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার গত চার দশকের মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো নিয়মিত কার্যাবলি চালাতে ঋণ করতে হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারকে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, নিয়মিত বিল পরিশোধ এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম সচল রাখতে এ ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছিল সরকার।

তৌফিকুল ইসলাম খান জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকারকে শুধু পরিচালন ব্যয় মেটাতে ২৩ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যে, নিয়মিত পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। আশির দশকে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। রাজস্ব সংগ্রহে দুর্বল ব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং স্থবির বিনিয়োগ রাষ্ট্রের আর্থিক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আগের সরকারের রেখে যাওয়া বকেয়া দায় পরিশোধ করতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।