NEWSTV24
অমর একুশে আজ
শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৬:২১ অপরাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক তীব্র আলোড়ন। বাঙালি জাতীয়তাবোধ সাম্য-সম্প্রীতি বা অসাম্প্রদায়িক বোধের বিকাশ ঘটে এই একুশের প্রেক্ষাপটেই। এ কারণে কবিতায় উচ্চারিত হয়- ভাষা মানে সভ্যতার সংবিধান। ভাষা মানে সন্ধ্যের তুলসীতলা, ভোরের আজান।১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির এক গৌরবময় অধ্যায়। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাগরণের চেতনা। একুশ মানে মাথা নত না করা। ফেব্রুয়ারি হচ্ছে ভাষার মাস। বসন্তের শিমুল পলাশ আর কৃষ্ণচূড়ার দিকে তাকালে মনে পড়ে ভাষার কথা। ভাষার জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের কথা। মনে পড়ে উজ্জ্বল সাহস নিয়ে দাঁড়ানো শহীদ মিনারের কথা। এ মাস সুন্দর স্বপ্নময় দিনের চেতনার-ভালোবাসার। যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে /তবে একলা চলো রে -এই বোধকে জাগ্রত করে। এই চেতনা মুক্তি যুদ্ধের, স্বাধীনতার।একুশে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয় রাষ্ট্রীয়ভাবে। পরে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনে মানুষের ঢল নামে শহীদ মিনারে।

কালো ব্যাজ পরে, খালি পায়ের প্রভাত ফেরি সমবেত কণ্ঠের গান- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি...। বায়ান্নর এই একুশে ফেব্রুয়ারিতে সালাম, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ বাংলার তরুণ-যুবকরা বুকের রক্ত রাজপথে ঢেলে যে সাহসী সংগ্রামের পথ তৈরি করেছিলেন, সে পথ ধরেই তো আসাদ-মতিউরের মতো কত প্রাণ আত্মদান করেছেন মাতৃভূমি এবং মাতৃভাষার জন্য। আর মুক্তিযুদ্ধে ঝরে গেছে ত্রিশ লাখ প্রাণ। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির অপরিসীম শক্তির প্রতীক।বাঙালির ইতিহাসে অসংখ্য উজ্জ্বল মাইলফলক আছে যা অর্জনের সমৃদ্ধিতে উজ্জ্বল। বাংলা ও বাংলা ভাষাভাসীর ইতিহাসে ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ এক গৌরবোজ্জ্বল দিন। ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারির স্বীকৃতি বাঙালির জন্য এক উজ্জ্বল মাইলফলক সূচক। এ সিদ্ধান্তের দুটো দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য (ক) আন্তর্জাতিক; (খ) আমাদের ক্ষেত্রে দেশীয়। প্রথমত, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ৪০০০-এর ওপর ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু বাংলাদেশে বাঙালির সম্পদ, অব্যয়- চির অক্ষয় এ সম্পদ। এই অমর একুশে ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিহিত রয়েছে বাঙালির জাতিসত্তা ও ভাষাভিত্তিক স্বাতন্ত্র্যের মৌলবীজ। সুতরাং অমর একুশকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাঙালির প্রতীকী বিজয় নির্দেশিত হয়েছে। এবং ভাষা শহীদদের আত্মদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে।

হাজার বছরের বাঙালির জন্য, তাঁদের মাতৃভাষা বাংলার জন্য আর কী বড় অর্জন হতে পারে? অমর একুশে এখন বিশ্বে তাৎপর্যমণ্ডিত প্রতীক। যা বাঙালির গর্ব আর অহংকারের উজ্জ্বল দ্যোতক। সারা বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশ নামে একটি দেশের কথা, বাঙালি জাতির ভাষার কথা জানতে পারছে। ভাষার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস একটি আলোকিত বাতিঘর। এ দিবসের তাৎপর্য হিসেবে ভাষাবিজ্ঞানী কবি হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন, -আমি মুগ্ধ আমি প্রীত আমাকে/স্বীকৃতি দিয়েছে, আমার প্রাণের/কথা আমার ভাষায় জানতে পারবো/বলে আমার হৃদয় স্পন্দন বেড়েছে, /সত্যিই গর্বিত আমি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম জাতিসংঘে মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণ দিয়ে এই ভাষাকে আরও তীব্রভাবে চেতনার উচ্চতায় পৌঁছে দেন। আজ আমরা গর্ব করে বলতে পারি বাঙালিই একমাত্র জাতি, যারা মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বুকের রক্ত ঢেলে দিতে দ্বিধা করেনি। বিশ্ববাসী স্বীকৃতি দিয়েছে আমাদের বাংলাকে, আমাদের প্রাণের মাতৃভাষাকে। জাতিসংঘ মহাসচিব এ দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বার্তা প্রেরণ করেন। এ দিবসটি পালনের মাধ্যমে বিশ্ববাসী তাদের জাতিসত্তার প্রধান বিষয় মাতৃভাষার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে। প্রতাপশালী অন্য ভাষার আগ্রাসন থেকে প্রতিটি জাতি স্ব স্ব মাতৃভাষাকে রক্ষার জন্য আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে।

একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি তাই মাতৃভাষা রক্ষার প্রতীক হয়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মর্যাদা অপরিসীম। একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক তীব্র আলোড়ন। বাঙালি জাতীয়তাবোধ সাম্য-সম্প্রীতি বা অসাম্প্রদায়িক বোধের বিকাশ ঘটে এই একুশের প্রেক্ষাপটেই। এ কারণে কবিতায় উচ্চারিত হয়- ভাষা মানে সভ্যতার সংবিধান। ভাষা মানে সন্ধ্যের তুলসীতলা, ভোরের আজান। প্রভাতফেরির ওই গান আমাদের মন-মননে নতুন আলোর পাতা ফেলে। ওই গান আমাদের ডাক দিয়ে যায় মুগ্ধতা মুখর প্রান্তরে, সুন্দরের খোলা হাওয়ায়। প্রথাগতভাবে এই ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় কবিতা উৎসব হয়, বাংলা একাডেমিতে চলে বইমেলা। শিল্প-সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি, একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয়। মূলমঞ্চে থাকে আলোচনা আবৃত্তি নৃত্য ও গানের আয়োজন। অন্যদিকে বসন্তবরণ এবার যদিও কিছু ব্যত্যয় হচ্ছে পরিবর্তিতে প্রেক্ষাপটে। একুশে ফেব্রুয়ারির বাংলাদেশ শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক নানা আয়োজনে মুগ্ধতা মুখর।