ছুটির দিনে বিদ্যুতের চাহিদা কমে। ফলে লোডশেডিংও কমার কথা। কিন্তু গতকাল শুক্রবার দেখা গেল উল্টো চিত্র। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির (পিজিসিবি) তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবারের চেয়ে শুক্রবার গড়ে এক হাজার মেগাওয়াট চাহিদা কমেছে। তার পরও লোডশেডিংয়ের তীব্রতা কমেনি। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়ে দুই হাজার মেগাওয়াটের ওপর লোডশেডিং হয়েছে। যদিও বেসরকারি সূত্রমতে, এ লোডশেডিংয়ের পরিমাণ তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি সংকটেই চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়নি। এতে দেশজুড়ে চলা প্রচণ্ড তাপদাহে নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছে মানুষ। বিশেষ করে, গ্রামাঞ্চলের কষ্ট অবর্ণনীয়। কারণ, পল্লি অঞ্চলে এলাকাভেদে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রচণ্ড গরমে লোডশেডিং যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে।এপ্রিলের শুরু থেকেই তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী দিনগুলোতে একাধিক তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস দিয়েছে। সরকারের প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি মাসে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়াতে পারে।
কিন্তু উৎপাদন পরিকল্পনা থাকলেও জ্বালানি ঘাটতির কারণে তা পূরণ করা কঠিন। গ্যাস ব্যবহার করে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৫৯৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। যদিও গ্রামভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট; অর্থাৎ গ্যাসের স্বল্পতার কারণে অর্ধেকের কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি সরবরাহ। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে হলে দিনে ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দরকার। যদি ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসও সরবরাহ করা হয়, তাহলে সাত হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ৯২ কোটি ঘনফুট। অর্থ সাশ্রয় করতেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল কম ব্যবহার করা হচ্ছে।কয়লাভিত্তিক আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ভারতে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ। এ ছাড়া বাঁশখালীতে এস আলমের এসএস পাওয়ারের একটি ইউনিটে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে। গ্যাস ও তেল স্বল্পতায় প্রায় পাঁচ হাজার মেগাওয়াট এবং মেরামত ও সংরক্ষণের অভাবে প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে আসছে না। ছুটির দিনেও বেড়েছে লোডশেডিং পিসিজিবির ওয়েবসাইট অনুসারে, গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় সারাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২০ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৩৮৫ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৬৩৫ মেগাওয়াট।
গতকাল দুপুর ১২টায় সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৩ হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট। আগের দিনের চেয়ে চাহিদা কম ছিল এক হাজার ৫৩ মেগাওয়াট। গতকাল সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ২৯৫ মেগাওয়াট, যা আগের দিনের চেয়ে এক হাজার ৯০ মেগাওয়াট কম। গতকাল ঘাটতি ছিল এক হাজার ৬৭২ মেগাওয়াট, যা বৃহস্পতিবারের চেয়ে ৩৭ মেগাওয়াট বেশি। একইভাবে বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় সারাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৯৮৮ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল দুই হাজার ২৪৯ মেগাওয়াট। গতকাল রাত ৮টায় সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩৯৬ মেগাওয়াট, যা আগের দিনের চেয়ে চাহিদা কম ছিল ৮৪১ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৫৭৮ মেগাওয়াট। বৃহস্পতিবারের চেয়ে সরবরাহ কম হয়েছে ৪১০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৮১৮ মেগাওয়াট, যা আগের দিনের চেয়ে ৪৩১ মেগাওয়াট কম।বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি ঢাকায় গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ঢাকা অঞ্চলেই ব্যবহৃত হয় পাঁচ হাজার ৮১৪ মেগাওয়াট, যা মোট উৎপাদনের ৩৪ শতাংশ। এরপর খুলনায় দুই হাজার দুই মেগাওয়াট, রাজশাহী এক হাজার ৮১৬ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামে এক হাজার ৫৫৬ মেগাওয়াট, কুমিল্লায় এক হাজার ৪৮৪ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে এক হাজার ২৫৪ মেগাওয়াট, রংপুরে ৯৭৮ মেগাওয়াট, সিলেটে ৬৩১ মেগাওয়াট ও বরিশালে ৫১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়।
দেশজুড়ে ভোগান্তি তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে বিদ্যুতের ঘাটতিতে রাজধানীর বাইরে প্রায় সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলাজুড়ে বেড়েছে লোডশেডিংয়ের মাত্রা। এতে জনজীবন যেমন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, তেমনি শিক্ষা, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়েছে মারাত্মক প্রভাব।ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। শহরের দাতিয়ারা এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের অভিযোগকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুর করেছেন বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিতরণ বিভাগ-১ এলাকায় প্রায় ৭৩ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে পিক আওয়ারে ২৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১০ থেকে ১১ মেগাওয়াট। ফলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।রাজশাহীতেও একই চিত্র। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সেখানে তাপমাত্রা ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগর ও গ্রামের মানুষ। রাজশাহী জেলায় চাহিদার চেয়ে ৩০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।বরিশাল অঞ্চলে গত ১৫ দিন ধরে চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ৪০০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে। এতে বোরো ধানসহ রবি ফসলের উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়েছে। একই সঙ্গে তীব্র গরমে কৃষি শ্রমিকরাও মাঠে কাজ করতে পারছেন না।
খুলনা অঞ্চলে চিংড়ি শিল্পে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের বিপর্যয়। বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক কারখানাকে প্রতিদিন লাখ টাকার বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।বাগেরহাট, নোয়াখালী, কুমিল্লা, শেরপুর, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীরাও পড়েছে চরম বিপাকে। বিশেষ করে চলমান এসএসসি পরীক্ষাকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন, পড়তে বসলে বিদ্যুৎ চলে যায়, আবার দীর্ঘ সময়েও ফিরে আসে না। এতে পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে।কুয়াকাটার পর্যটন খাতেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। হোটেল-মোটেলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় পর্যটকরা বুকিং বাতিল করছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করা গেলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি সম্ভব নয়। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এ ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে বলে সতর্ক করেন তিনি