
ইসলামে যেমন ইবাদত-বন্দেগির গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি সুস্থ দেহ গঠনের জন্য বৈধ খেলাধুলা ও শরীরচর্চারও অনুমোদন রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও দৌড় প্রতিযোগিতা, তীরন্দাজি ও ঘোড়দৌড়ের মতো বিভিন্ন শারীরিক অনুশীলনকে উৎসাহিত করেছেন।
তবে ইসলামে প্রতিটি কাজের জন্য উপযুক্ত স্থান ও পরিবেশ নির্ধারিত রয়েছে। কোনো স্থানের ধর্মীয় মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষার বিষয়টিও শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। তাই অনেক সময় কোনো কাজ নিজে বৈধ হলেও বিশেষ কোনো স্থানে তা করা অনুচিত বা নিষিদ্ধ হয়ে যেতে পারে। ঈদগাহ মাঠে খেলাধুলার বিষয়টিও এ ধরনের একটি আলোচ্য বিষয়।
ইসলামে পবিত্র স্থানসমূহের মর্যাদা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের সম্মান করে, নিশ্চয়ই তা অন্তরের তাকওয়ার পরিচায়ক।’ (সুরা : হাজ, আয়াত : ৩২)
ঈদগাহ এমন একটি স্থান, যেখানে মুসলমানরা বছরে দুইবার বৃহৎ জামাতে ঈদের নামাজ আদায় করেন। তাই এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নিদর্শন (শাআইরে ইসলাম)-এর অন্তর্ভুক্ত। এ কারণে এর মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষা করা মুসলমানদের কর্তব্য।
ফিকহের কিতাবসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওয়াকফকৃত ঈদগাহ সম্পূর্ণরূপে মসজিদ না হলেও কিছু বিধানের ক্ষেত্রে মসজিদের হুকুম প্রযোজ্য হয়। হানাফি ফকিহগণ লিখেছেন যে, ‘ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মত হলো, ইমামের অনুসরণে ঈদের নামাজ আদায় বৈধ হওয়ার দিক থেকে ঈদগাহকে মসজিদের হুকুম দেওয়া হবে। তবে এর নির্মাতা মূলত একে মসজিদ হিসেবে নির্মাণ করেননি। তাই এটিকে পূর্ণাঙ্গ মসজিদ না বললেও এর মর্যাদা নষ্ট হয় না।’ (রাদ্দুল মুহতার, ২/৪৩০, আল-বাহরুর রায়েক, ২/৬৫, আন-নাহরুল ফায়েক, ১/২৮৮)
এ কারণেই ফকিহয়ে কেরামগণ বলেছেন, ঋতুবতী নারী বা গোসল ফরজ অবস্থায় থাকা ব্যক্তির ঈদগাহে প্রবেশ বৈধ।
কারণ এটি পূর্ণাঙ্গ মসজিদ নয়। তবে একই সঙ্গে তারা এ স্থানকে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।
ঈদগাহ মাঠে খেলাধুলার হুকুম
খেলাধুলা মূলত জায়েজ। যদি তাতে জুয়া, অশ্লীলতা, নামাজ নষ্ট হওয়া বা অন্য কোনো হারাম বিষয় না থাকে, তাহলে সাধারণ স্থানে এসব খেলাধুলা বৈধ। কিন্তু ওয়াকফকৃত ঈদগাহ মাঠের বিষয়টি ভিন্ন। কারণ এটি আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্ধারিত ও ধর্মীয় মর্যাদাসম্পন্ন স্থান। খেলাধুলার সময় সাধারণত দৌড়াদৌড়ি, হাসি-তামাশা, চিৎকার-চেঁচামেচি এবং নানা ধরনের কর্মকাণ্ড হয়ে থাকে, যা ঈদগাহের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে ফকিহগণ সতর্কতামূলকভাবে বলেছেন, ‘সতর্কতার স্বার্থে ঈদগাহকে সাধারণ স্থানের মতো ব্যবহার না করে মসজিদের মর্যাদার নিকটবর্তী হিসেবে গণ্য করা উচিত।’ (আল-বাহরুর রায়েক, ৫/৪১৭, রাদ্দুল মুহতার, ৬/৫৪৫)
সুতরাং খেলাধুলা নিজে বৈধ হলেও ওয়াকফকৃত ঈদগাহে খেলাধুলা করা সমীচীন নয়। বিশেষ করে যখন তা ঈদগাহের সম্মান ও পবিত্রতার পরিপন্থী বলে বিবেচিত হয়। তাই আল্লাহর দ্বীনের নিদর্শন ও ইবাদতের জন্য নির্ধারিত স্থানগুলোর মর্যাদা সংরক্ষণ করা একজন মুমিনের কর্তব্য।
অতএব, শারীরিক অনুশীলনমূলক খেলাধুলা ইসলামে জায়েজ আছে। তবে ওয়াকফকৃত ঈদগাহ মাঠ সাধারণ খেলার মাঠ নয়; এটি মুসলমানদের একটি ধর্মীয় ও ইবাদতসংক্রান্ত স্থান। যদিও তা পূর্ণাঙ্গ মসজিদ নয় এবং কিছু ক্ষেত্রে মসজিদের সব বিধান প্রযোজ্য হয় না, তবুও এর মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য ফকিহরা সেখানে খেলাধুলা ও অনুরূপ কর্মকাণ্ডকে অনুচিত বলেছেন। তাই একজন সচেতন মুসলমানের জন্য উত্তম হলো শরীরচর্চা ও খেলাধুলার জন্য অন্য কোনো সাধারণ মাঠ বা উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করা এবং ঈদগাহের ধর্মীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা। কারণ আল্লাহর নিদর্শনের সম্মান রক্ষা করা তাকওয়ারই একটি গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ।