NEWSTV24
ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগ
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬ ১০:৪৯ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

চলমান সংকট কাটাতে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পুরো পর্ষদ বাতিল করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রোববার রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখন থেকে তিনি পর্ষদের যাবতীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আগের পর্ষদ ভেঙে বাংলাদেশ ব্যাংকই এই পর্ষদ গঠন করেছিল।বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আমানতকারীদের স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে সন্ধ্যায় ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন গভর্নর। এদিন ব্যাংকটিকে বিশেষ ধার হিসেবে আড়াই হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়।বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক শুরু হয়। তাঁকে অপসারণসহ ৭ দফা দাবিতে গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে আন্দোলন করে আসছে একটি পক্ষ। এ নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে টাকা তুলে নিচ্ছেন আমানতকারীরা। দৈনিক যে পরিমাণ টাকা জমা হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি তুলে নেওয়ার কারণে তারল্য সংকটে অনেক সেবা সীমিত করতে হয়েছে ব্যাংকটিকে। ব্যাংকটির অনলাইন স্থানান্তর, এটিএম থেকে টাকা উত্তোলনসহ অনেক ধরনের সেবা মিলছে না। গত সপ্তাহে গভর্নরের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর এমডিদের এক বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের এ সংকট অন্য ব্যাংকে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা জানিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। গ্রাহকদের চাপ সামলাতে ইসলামী ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে গত সপ্তাহে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার চেয়ে আবেদন করে।

রোববার সন্ধ্যায় ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলতাফ হুসাইনের নেতৃত্বে শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। এরপর রাত ১০টার দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় জানানো হয়, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ সব পর্ষদ সদস্যের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫ ধারা ও ৪৭(৩) ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে এবং ব্যাংক-কোম্পানি, আমানতকারী ও জনসাধারণের স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭(৩) ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন পর্ষদের যাবতীয় ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন।ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হুসাইনের নেতৃত্বে রোববার বিকেল ৪টায় ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহীরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যান। সন্ধ্যা ৭টার পর তারা বের হন। ওই সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিক থেকে নানা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। সেখানে ব্যাংকটিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক শেষে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হুসাইন সাংবাদিকদের বলেন, চলমান পরিস্থিতির মধ্যে নগদ জমা ও উত্তোলন প্রায় সমান সমান। তবে আরটিজিএস, ইএফটিসহ অনলাইন মাধ্যমে তহবিল স্থানান্তর বেড়ে যাওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক রোববার প্রথম তাদের আড়াই হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে। এই অর্থ পাওয়ার পর লেনদেনের বর্তমান অবস্থা এবং তা দিয়ে কতটা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়।গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত এমডি বলেন, গ্রাহকদের আশ্বস্ত করতে চাই লেনদেনে কোনো সমস্যা হবে না। আমানতকারীরা সময়মতো টাকা ফেরত পাবেন। দ্রুত এটিএম বুথ, ইন্টারনেট ব্যাংকিংসহ সব লেনদেন স্বাভাবিক হবে। চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ নিয়ে কেন আলোচনা হবে? এটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেখবে। আমরা শুধু পরিচালনাগত দিক নিয়ে আলোচনা করেছি।

পবিত্র ঈদুল আজহার আগে শেষ কর্মদিবসে গত ২৪ মে খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের পদ হারান। এর আগে গত ১২ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে এমডিকে ৩১ মে পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠায় পর্ষদ। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর গত ১৭ মার্চ ব্যাংকটিতে নিয়োগ পাওয়া জামায়াতপন্থি হিসেবে পরিচিত পরিচালক আব্দুল জলিলকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ রকম পরিস্থিতির মধ্যে ১ জুন থেকে গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল, এমডি ওমর ফারুক খানের পুনর্বহালসহ সাত দফা দাবিতে আন্দোলন চলছে। এর পেছনে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন আছে বলে আলোচনা আছে। ২০২২ সাল থেকে ইসলামীসহ শরিয়াহভিত্তিক ছয়টি ব্যাংক তারল্য সংকটে চলছিল। ওই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে চলতি হিসাব ঘাটতি রেখেও বিশেষ জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর লেনদেনের সুযোগ দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে এ রকম সুযোগ বন্ধ করে দেয়। নতুন করে টাকা উত্তোলনের চাপ সামলাতে তখন ব্যাংকগুলোকে বিশেষ ধার হিসেবে ৬৫ হাজার কোটি টাকা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বিশেষ ধার হিসেবে নেওয়া ১৩ হাজার কোটি টাকা ফেরত দিলেও অন্য ব্যাংকগুলোর কাছে ৫২ হাজার কোটি টাকা আটকে আছে। এ রকম অবস্থায় এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে সরকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ইসলামী ব্যাংকের চলমান পরিস্থিতি শুরুর আগে গত মে মাস শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব দেনা পরিশোধ করে ব্যাংকটির চলতি হিসাবে সাত হাজার কোটি টাকার বেশি স্থিতি ছিল। তবে গত কয়েক দিনে প্রচুর টাকা উত্তোলনের কারণে চলতি হিসাবে স্থিতি প্রায় শূন্যে নেমে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার দেওয়ায় আবার পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এখন সংকট কেটে যাবে বলে তিনি আশা করেন।চলমান কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ব্যাংকটির পরিচালকরা ব্যাংকে আসতে পারছিলেন না। যে কারণে নীতিনির্ধারণী কোনো সভা হচ্ছিল না। নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে অনলাইনে একটি সভা হলেও তা নিয়ম মেনে হয়নি। ওই পর্ষদ সভায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কেউ উপস্থিত ছিলেন না। আবার কোনো এজেন্ডা উপস্থাপন করা হয়নি। এ রকম অবস্থায় ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত আটকে আছে। আবার ব্যাংকটিতে এখন নিয়মিত এমডি নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তারা আশা করেন।