নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত সংবিধানের ৫৮(ক) ও ৫৮(২ক) অনুচ্ছেদ পুনর্বহালে সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন। তবে জাতীয় সংসদে সংবিধানের কিছু পরিবর্তন পাস হওয়া ছাড়া এ ব্যবস্থা ফিরবে না। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে হলে পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ৯৯, ১২৩, ১৪৭, ১৫২ এবং তৃতীয় তপশিলে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তা সংশোধন করতে হবে।তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনে সংবিধানের যে ত্রয়োদশ সংশোধনী আনা হয়েছিল, তা গত বছরের নভেম্বরে আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে পুনর্বহাল হয়েছে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে, এর অন্তত পাঁচটি পরিবর্তন না করা পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে ত্রয়োদশ সংশোধনী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হবে না।আইনবিদ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এমন মত দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগের রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। যদিও সংসদে সংবিধান সংশোধন ছাড়াই আদালতের রায়ে অষ্টম সংশোধনী বাতিল হয়েছিল। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ও কার্যকর হয়েছে সংবিধান সংশোধন ছাড়াই। পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিল না হওয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের ক্ষেত্রে তা হবে না।
২০১১ সালের জুনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, গণভোটের বিধান বাতিলসহ সংবিধানে অর্ধশতাধিক সংশোধনী এনেছিল। সংযোজন করেছিল ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ। ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বরের রায়ে হাইকোর্ট এ দুটি অনুচ্ছেদ সংযোজনকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থি আখ্যা দিয়ে বাতিল করেন। হাইকোর্টের ক্ষমতা-সংক্রান্ত ৪৪(২), তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত ৫৮(ক) ও ৫৮(২ক) এবং গণভোট-সংক্রান্ত ১২৪(ক) অনুচ্ছেদ পঞ্চদশ সংশোধনীর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে আদেশ দেন।গতকাল আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সেই রায় বহাল রেখেছেন। পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিলে যে তিনটি আপিল হয়েছিল, তা খারিজ করে দিয়েছেন। ফলে পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা সংবিধানের বাকি ৪৮টি পরিবর্তনের কী হবে এই সিদ্ধান্ত নেবে সংসদ। সংসদকে সংবিধানের অন্যান্য অনুচ্ছেদ সংশোধন করতে হবে। এ কারণেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরবে না।
১৯৯৬ সালে স্বল্পমেয়াদি ষষ্ঠ সংসদে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন করা হয়। এই ব্যবস্থা প্রবর্তনে শুধু সংবিধানের ৫৮(ক) ও ৫৮(২ক) অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়নি; ১৪৭ ও ১৫২ অনুচ্ছেদে যুক্ত করা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পদের বেতন-ভাতার বিধান এবং পদ-সংক্রান্ত ব্যাখ্যা। তৃতীয় তপশিলে যুক্ত করা হয় এসব পদের শপথ।পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ বিলুপ্তের পাশাপাশি ১৪৭ ও ১৫২ অনুচ্ছেদ এবং তৃতীয় তপশিলও সংশোধন করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হবেন সর্বশেষ প্রধান বিচারপতি। তাঁকে না পাওয়া গেলে পূর্ববর্তী অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বা আপিল বিভাগের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হবেন প্রধান উপদেষ্টা।ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী, তাদের কাউকে পাওয়া না গেলে রাষ্ট্রপতি গ্রহণযোগ্য কাউকে নিয়োগ দেবেন আলোচনার মাধ্যমে। গ্রহণযোগ্য কাউকে পাওয়া না গেলে রাষ্ট্রপতি নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করবেন। এ বিধানেই ২০০৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টা হয়েছিলেন, যা দেশকে শেষ পর্যন্ত জরুরি অবস্থার দিকে নিয়ে যায়।
পঞ্চদশ সংশোধনী সংবিধানের ৯৯(১) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিধান করা হয়, অবসরের পর বিচারকরা প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না। আপিল বিভাগের হাইকোর্টের রায় বহাল রাখায় সংসদে ৯৯(১) অনুচ্ছেদ সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নিতে পারবেন না। অথচ ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনর্বহালে ৫৮(২ক) অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হবেন।ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে ১২৩(৩ক) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিধান করা হয়েছে, নির্বাচন হবে সংসদের মেয়াদ পূরণের আগের ৯০ দিনের মধ্যে। এই বিধান সংশোধন না করলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে সংসদ বহাল থাকা অবস্থায়।পঞ্চদশ সংশোধনীর মামলায় আপিলকারীদের আইনজীবীরা আদালতের সামনে এই যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তাই পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের পক্ষে বলেছিলেন। আপিল বিভাগ তা গ্রহণ করেননি। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং পর্যবেক্ষণ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর জানা যাবে।
২০০৪ সালেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলে মামলা হয়েছিল। পরের বছর হাইকোর্ট নির্বাচনকালীন এই ব্যবস্থাকে বহাল রেখেছিলেন। কিন্তু ২০১০ সালে প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ ৪:৩ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সংবিধানের চেতনার পরিপন্থি আখ্যা দিয়ে বাতিল করেন। তবে রিভিউ আবেদনে গত নভেম্বরে সাত সদস্যের আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিক্রমে ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনর্বহাল করেছেন।অতীতে দুটি সংশোধনী আদালতের রায়ে পুনবর্হালের নজির রয়েছে। ১৯৮৮ সালের ৭ জুন জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সংসদ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী পাস করে। এতে রাষ্ট্রধর্ম, ছয় বিভাগের হাইকোর্টের বেঞ্চ প্রবর্তনসহ সংবিধানে চারটি পরিবর্তন আনা হয়। পরের বছর আপিল বিভাগ রাজধানীর বাইরে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপন-সংক্রান্ত অংশটুকু বাতিল করেন। আদালতের রায়েই হাইকোর্ট বেঞ্চ বাতিল হয়ে যায়। সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করা হয় এই রায় মেনে। সংসদে সংবিধানে আর পরিবর্তন আনা হয়নি।
উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদকে দিয়ে ২০১৪ সালে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস করে আওয়ামী লীগ। বিলুপ্ত করা হয় ৯৬ অনুচ্ছেদের ২ থেকে ৮ উপদফা। বিলুপ্ত করা হয় বিচারপতিতের অসদাচরণ তদন্তের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। ২০১৬ সালের ৫ মে হাইকোর্টের তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। ২০১৭ সালের ৩ জুলাই তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সর্বসম্মতিতে এই রায় বহাল রাখেন। একই বছরের ২৪ ডিসেম্বর রিভিউ আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।সেই আবেদন নিষ্পত্তি করে গত ২১ অক্টোবর আপিল বিভাগ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহালের রায় দেন। সংবিধানে ৯৬(২) অনুচ্ছেদে এখনও বলা রয়েছ, প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার অনুমোদন ছাড়া রাষ্ট্রপতি কোনো বিচারককে অপসারণ করতে পারবেন না। তবে ২০২৪ সালেই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠিত হয়েছে। পুনর্বহালের পর কাউন্সিলের সুপারিশে সরাসরি ৩ জন বিচারপতিকে অপসারণ করেছেন রাষ্ট্রপতি। তদন্তের মুখে থাকা অবস্থায় ১৪ জন বিচারপতি পদত্যাগ করেছেন। যদিও সংবিধানে ৯৬(২) অনুচ্ছেদও রয়ে গেছে। সংবিধানের এ দুটি সংশোধনী বাতিলে আদালতের রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকরে অন্য কোনো অনুচ্ছেদের বাধা ছিল না, যা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষেত্রে রয়েছে।