NEWSTV24
চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে আসা ‘মুন ট্রি’
শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬ ১৮:২৫ অপরাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

মহাকাশ জয়ের ইতিহাসে নাসার ‘অ্যাপোলো ১৪’ অভিযান শুধু চাঁদের মাটিতে মানুষের পদচিহ্নের জন্যই স্মরণীয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পৃথিবীতে ফিরে আসা এক ভিন্ন ধরনের স্মৃতিও। চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে আসা কয়েকশ গাছের বীজ থেকে জন্ম নেওয়া এসব গাছ আজ পরিচিত ‘মুন ট্রি’ বা ‘চাঁদের গাছ’ নামে। সাধারণ দেখতে হলেও এসব গাছ বহন করছে মানবজাতির মহাকাশ অভিযানের এক অনন্য ইতিহাস।

১৯৭১ সালের ৩১ জানুয়ারি চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে নাসার ‘অ্যাপোলো ১৪’ মহাকাশযান। এতে ছিলেন তিন মহাকাশচারী অ্যালান শেপার্ড, এডগার মিচেল ও স্টুয়ার্ট রুসা। চাঁদে পৌঁছানোর পর শেপার্ড ও মিচেল চাঁদের পৃষ্ঠের ‘ফ্রা মাউরো’ এলাকায় অবতরণ করেন। অন্যদিকে কমান্ড মডিউলের পাইলট স্টুয়ার্ট রুসা চাঁদের কক্ষপথে থেকে পুরো অভিযান পরিচালনা করেন।

তবে রুসার এই যাত্রার সঙ্গে যুক্ত ছিল আরেকটি বিশেষ দায়িত্ব, যা শুরুতে খুব বেশি আলোচনায় আসেনি। নিজের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র রাখার ব্যাগে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন কয়েকশ গাছের বীজ। এই উদ্যোগ ছিল নাসা ও যুক্তরাষ্ট্রের বন বিভাগের যৌথ একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পের অংশ।

এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল, চাঁদের চারপাশে ভ্রমণের পর মহাকাশের পরিবেশ গাছের বীজের অঙ্কুরোদগম বা বেড়ে ওঠায় কোনো প্রভাব ফেলে কি না, তা পরীক্ষা করা। মহাকাশচারী হওয়ার আগে স্টুয়ার্ট রুসা যুক্তরাষ্ট্রের বন বিভাগে ‘স্মোকজাম্পার’ হিসেবে কাজ করেছিলেন। দাবানল নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতার কারণে তিনিই এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

পরীক্ষার জন্য লবললি পাইন, সিকামোর, সুইটগাম, রেডউড ও ডগলাস ফারের মতো কয়েকটি গাছের বীজ নেওয়া হয়েছিল। একটি বিশেষ পাত্রে রাখা এসব বীজ অ্যাপোলো ১৪ অভিযানের সময় চাঁদের কক্ষপথে ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসে।

পৃথিবীতে ফেরার পর বীজগুলো নিয়ে তৈরি হয় নতুন জটিলতা। জীবাণুমুক্ত করার প্রক্রিয়ায় বীজ রাখার পাত্র ভেঙে গেলে সব বীজ একসঙ্গে মিশে যায়। এতে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করেছিলেন, হয়তো এসব বীজ আর অঙ্কুরিত হবে না। তবে শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কা সত্য হয়নি।

গবেষণার পর দেখা যায়, চাঁদের চারপাশে ঘুরে আসা বীজগুলো পৃথিবীতে থাকা একই ধরনের বীজের মতোই স্বাভাবিকভাবে অঙ্কুরিত হয়েছে। এসব বীজ থেকে তৈরি হয় ৪০০টির বেশি চারা। গবেষকরা জানান, মহাকাশ ভ্রমণের কারণে গাছগুলোর মধ্যে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেনি।

তবে মুন ট্রির গুরুত্ব ছিল তাদের বৈজ্ঞানিক পরিবর্তনে নয়, বরং তাদের অসাধারণ যাত্রার ইতিহাসে। ১৯৭৫ ও ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এসব চারা বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বিতরণ করা হয় এবং অ্যাপোলো অভিযানের স্মারক হিসেবে রোপণ করা হয়।

নাসার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি ভবন, বিশ্ববিদ্যালয়, পার্ক ও মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে এখনো কিছু মুন ট্রি রয়েছে। মেরিল্যান্ডের গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও এসব গাছের অস্তিত্ব রয়েছে।

তবে সময়ের সঙ্গে অনেক মুন ট্রির তথ্য হারিয়ে গেছে। কিছু গাছ ঝড়, রোগ, নির্মাণকাজ কিংবা অবহেলার কারণে নষ্ট হয়েছে। আবার কিছু গাছ এখনো নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, যেগুলো দেখতে সাধারণ গাছের মতো হলেও বহন করছে চাঁদ ভ্রমণের অবিশ্বাস্য স্মৃতি।

১৯৯৬ সালে ইন্ডিয়ানার এক শিক্ষিকা জোয়ান গোবল একটি মুন ট্রির ফলক দেখে এর ইতিহাস অনুসন্ধান শুরু করেন। পরে নাসার কর্মকর্তা ডেভিড আর. উইলিয়ামসের সহায়তায় হারিয়ে যাওয়া এই প্রকল্পের তথ্য আবার সামনে আসে।

মুন ট্রি শুধু একটি গাছ নয়, এটি মহাকাশ গবেষণা ও মানব কৌতূহলের এক জীবন্ত প্রতীক। জাদুঘরে সংরক্ষিত কোনো মহাকাশযানের মতো নয়, প্রকৃতির মাঝেই বেড়ে ওঠা এসব গাছ আজও মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—মহাকাশ অভিযানের গল্প কখনো কখনো পৃথিবীর মাটিতেও শিকড় গেড়ে বেঁচে থাকে।