NEWSTV24
বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের ইঙ্গিত ইরানের
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬ ১৯:০৯ অপরাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার মধ্যেই এবার লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালিকেও কৌশলগত চাপের অংশ হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। তেহরানের বার্তা, প্রয়োজন হলে ইয়েমেনের মিত্র হুতি গোষ্ঠীর মাধ্যমে এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন এবং বিশ্ব বাণিজ্য নতুন করে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনাও আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভেতরে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে, অন্যদিকে ইয়েমেনে হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও হামলা বাড়িয়েছে। এর পাল্টা কৌশল হিসেবে সংঘাতের পরিধি পারস্য উপসাগর ছাড়িয়ে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত করতে চাইছে তেহরান।

তাদের মতে, শুধু হরমুজ নয়, বাব আল-মান্দেবেও চাপ সৃষ্টি করে ওয়াশিংটনের ওপর কৌশলগত প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে ইরান। লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করা এই জলপথ দিয়ে সৌদি আরবের বিপুল পরিমাণ তেল এবং বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি জানায়, সোমবার ইয়েমেনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, সৌদি আরব ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখলে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের পথে হাঁটতে পারে। তার দাবি, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন হুতি আন্দোলন আনসারুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ। তার অভিযোগ, ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালাতে সৌদি আরবকে উৎসাহিত করছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—দুই প্রণালিতেই সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ফাওয়াজ গেরগেস রয়টার্সকে বলেন, প্রয়োজন হলে ইরান সর্বোচ্চ পর্যায়ের পদক্ষেপ নিতেও প্রস্তুত। তার মতে, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথ একই সঙ্গে ঝুঁকির মুখে ফেলার সক্ষমতার বার্তা দিতে চাইছে তেহরান।

বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এখন পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ নয়; বরং এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের মাধ্যমে সংঘাত ধীরে ধীরে বিস্তৃত হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক ডেনিস রস বলেন, ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। তার মতে, শুধু আলোচনা শুরু করাই নয়, উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য একটি সমঝোতায় পৌঁছানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা গবেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, বাব আল-মান্দেব নিয়ে হুতিদের সাম্প্রতিক হুমকি ইরানের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হতে পারে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা আরও বাড়ায়, তাহলে তেহরান হুতি মিত্রদের ব্যবহার করে এ জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার চেষ্টা করতে পারে।

সউদী আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করছে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তবে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ পুরো অঞ্চলের জন্যই অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর হুতি গোষ্ঠী লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব সামনে আনে। সে সময় বহু আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিকে লোহিত সাগরের পরিবর্তে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল করতে হয়, ফলে পরিবহন ব্যয় ও সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তথ্যসূত্র: রয়টার্স