ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় এখন কোনো স্থায়ী সীমানা নেই; আছে কেবল কিছু হলুদ রঙের কংক্রিটের ব্লকের খেলা। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী রাতের আঁধারে এই সিমেন্টের ব্লকগুলো সামান্য পশ্চিম দিকে সরিয়ে দিলেই বদলে যাচ্ছে গাজার ভৌগোলিক মানচিত্র। কথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তির পর দুই পক্ষের সীমান্ত চিহ্নিত করতে বসানো এই ‘ইয়েলো লাইন’ (Yellow Line) বা হলুদ সীমানারেখাটিই এখন গাজাবাসীর জন্য নতুন এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয়কারী সংস্থা (OCHA)-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতেও গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকা এই সীমাবদ্ধ প্রবেশাধিকার অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে জুন মাসের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪.৯ শতাংশে। সীমানার এই ক্রমাগত সম্প্রসারণকে স্থানীয় ফিলিস্তিনি ও বিশ্লেষকরা বর্ণনা করছেন এক ‘ধীরগতির মৃত্যু’ (Creeping Death) হিসেবে।
ভিটামাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে হাজারো পরিবার
মধ্য গাজার দেইরে আল-বালাহ এলাকার বাসিন্দা হাজেম সাঈদ জানান, গত ১৭ জুলাই রাতে কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই ড্রোন (কোয়াডকপ্টার) থেকে এলাকা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পরপরই সাঁজোয়া যান নিয়ে এসে ইয়েলো লাইনের ব্লকগুলোকে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ মিটার পশ্চিমে সরিয়ে দেয় ইসরায়েলি বাহিনী।
এখন এই কংক্রিটের ব্লকগুলো সরাসরি মানুষের বসতবাড়ির দুই থেকে চার মিটারের মধ্যে অবস্থান করছে। এর ফলে আবু ঘরাবা, আবু গালিবা ও আল-তারহুনি পরিবারের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ও বসতভিটা ইসরায়েলের দখলে চলে গেছে। বহু পরিবার তাদের একমাত্র জীবিকার সম্বলটুকু হারিয়ে ভিটেমাটিহীন হয়ে পড়েছে।
গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় ‘আহল আল-সুমুদ’ আশ্রয়শিবিরের তত্ত্বাবধায়ক রমজান আবু আম্মো জানান, তারা মাত্র ৭০ মিটার দূরে ইয়েলো লাইনের বিপজ্জনক উপস্থিতির মধ্যেই তাঁবু খাটিয়ে বাস করছেন। প্রতিদিন মাথার ওপর এসে পড়ছে গোলা ও বোমার স্প্লিন্টার। কিন্তু তাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।
উত্তরে জমি সমতল ও সামরিক চৌকি স্থাপন
উত্তর গাজায় ইয়েলো লাইনের এই আগ্রাসন আরো তীব্র। সেখানে সীমান্তরেখা দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ইসরায়েলি বুলডোজার ও ড্রোন প্রতিদিন বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। তাল আজ-জাতারে উঁচু মাটির টিলা বানিয়ে নজরদারি টাওয়ার বসানো হয়েছে, যা পুরো এলাকাকে একটি সার্বক্ষণিক উন্মুক্ত সামরিক অঞ্চলের রূপ দিয়েছে।
এদিকে, গাজা সিটি পৌরসভার জনসংযোগ প্রধান মোহাম্মদ আল-সারসাবি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, শহরের প্রায় অর্ধেক এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও পানি সরবরাহ টিম পৌঁছাতে পারছে না। ইয়েলো লাইনের ভেতরের অংশে আটকা পড়েছে বেশ কয়েকটি জরুরি পানির কূপ ও পয়োনিষ্কাশন কেন্দ্র। শহরের প্রায় সাড়ে ৯ লাখ অধিবাসীর অর্ধেকেরও বেশি এখন সামান্য জায়গায় গাদাগাদি করে বাস করছে, যা সেখানে মারাত্মক পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
১৯৬৭ সালের পশ্চিম তীর দখলের পুনরাবৃত্তি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ আল-তানানির মতে, ইসরায়েল মূলত একটি পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি দখলের পথেই হাঁটছে। এর আগে সামরিক উপস্থিতি ১৯৫ বর্গকিলোমিটারে সীমাবদ্ধ থাকলেও তা এখন বাড়িয়ে ২৩৫ বর্গকিলোমিটারে উন্নীত করা হয়েছে।
আল জাজিরার এক অনুসন্ধানী তদন্তেও দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে গাজা উপত্যকাজুড়ে অন্তত ৪০টি স্থায়ী ইসরায়েলি সামরিক আউটপোস্ট তৈরি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কৌশল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর পশ্চিম তীর দখলের পদ্ধতির কথা মনে করিয়ে দেয়।
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের সাম্প্রতিক এক বক্তব্য এই পরিকল্পনার সত্যতাই নিশ্চিত করে। এক সমাবেশে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, “তিন বছর আগে কেউ যদি বলতো আমরা গাজা উপত্যকার ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করবো, কেউ বিশ্বাস করতো না... গাজা এখন আমাদের।”
গাজা সরকারি সংবাদ মাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েল ৩,৭৯৫ বার চুক্তি লঙ্ঘন করেছে, যার ফলে ১,১৬৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আর এসব হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ঘটেছে এই অগ্রসরমাণ ইয়েলো লাইনের আশেপাশে।