NEWSTV24
ইমরান খানকে কারাগারে রেখে বিপাকে সরকার
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬ ২০:১৫ অপরাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

এমন রাজনৈতিক বন্দি আছেন, যাদের জীবিত থাকাই শাসকদের আতঙ্কিত করে। আবার এমন শহীদও আছেন, যাদের মৃত্যুর স্মৃতিই শাসকদের ভয় দেখায়। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দেশটির ক্ষমতা কাঠামোর জন্য এক জটিল পরিস্থিতির তৈরি করেছেন—যার অস্তিত্বই এখন শাসকদের অস্বস্তিতে ফেলে, আর কারাগারে তার মৃত্যু ঘটলে সেটি পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র হয়ে উঠতে পারে। 

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সামরিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা দুই রাজনৈতিক পরিবার—শরিফ ও ভুট্টো-জারদারি পরিবার—এখন সেই ফাঁদেই আটকে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে।

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ৭৩ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসককে মেডিকেল বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা এবং পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

একটি স্বাভাবিক সাংবিধানিক রাষ্ট্রে এসব বিষয়কে বিশেষ কোনো ‘স্বস্তি’ বা ছাড় হিসেবে বিবেচনা করা হতো না। এগুলো হতো একজন বন্দির সাধারণ অধিকার। কিন্তু পাকিস্তানে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে চিকিৎসক দেখার অধিকারও এখন সাংবিধানিক অগ্রগতি হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে।

সরকার রায়ের একটি অংশকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করায় পরিস্থিতির বিদ্রুপ আরো স্পষ্ট হয়েছে। নির্বাচনী প্রকৌশল, রাজনৈতিক মামলা, ব্যাপক দমন-পীড়ন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকৃতি যেন রাষ্ট্রের জন্য সহনীয়; কিন্তু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া যেন সাংবিধানিক শৃঙ্খলার জন্য বড় হুমকি।

এর আড়ালে অবশ্য হাস্যকর পরিস্থিতির চেয়েও বড় বিষয় হলো—আতঙ্ক। ইমরান খানকে কারাগারে পাঠানোর উদ্দেশ্য ছিল তাকে রাজনৈতিকভাবে ছোট করে দেওয়া। জনসভা, টেলিভিশন ও রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা, মামলার পর মামলা দিয়ে তাকে ব্যস্ত রাখা, তার দলকে দুর্বল করা এবং বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে এমন কিছু অর্জন করা, যা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় সম্ভব হয়নি।

কিন্তু ফল হয়েছে উল্টো। রাষ্ট্র একজন মানুষকে বন্দি করেছে, আর বন্দিত্ব সেই মানুষটিকেই প্রতীকে পরিণত করেছে। এটাই আসিম মুনিরের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন। একজন সুস্থ বন্দিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। কিন্তু দৃশ্যত অসুস্থ হয়ে পড়া একজন বন্দি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগে পরিণত হয়। আর কারাগারে মারা যাওয়া একজন রাজনৈতিক বন্দি ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। আর ইতিহাস সংসদের চেয়ে অনেক কম বাধ্য।

বিদেশে আসিম মুনিরকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে স্বাগত জানানো হতে পারে, রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে তার ছবি তোলা হতে পারে কিংবা তাকে পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের অপরিহার্য ব্যবস্থাপক হিসেবে দেখা হতে পারে। কিন্তু দেশের ভেতরে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে বছরের পর বছর কারাগারে রাখতে বাধ্য হওয়া শক্তির আত্মবিশ্বাস নয়, বরং ভয়েরই প্রকাশ।

ক্ষমতার পদক যত বড় হচ্ছে, রাজনৈতিক কল্পনাশক্তি যেন ততই ছোট হয়ে আসছে।

ইমরান খানকে মুক্তি দিলে তিনি কারাগারে যাওয়ার আগের সেই রাজনীতিক হিসেবে ফিরবেন না। বরং বয়সে প্রবীণ, শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং আরো বেশি প্রতীকী শক্তি নিয়ে ফিরে আসতে পারেন। তার হাতে থাকবে গণ রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী একটি যুক্তি—দেশের পুরো রাষ্ট্রীয় ও দমনমূলক কাঠামোকে একজন মানুষকে ভোটারের কাছে পৌঁছানো থেকে বিরত রাখতে ব্যবহার করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, কারাগারে ইমরান খানের মৃত্যু ঘটলে বিষয়টি আর রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সেটি রাজনৈতিক বিস্ফোরণের রূপ নিতে পারে।

মৃত্যু নির্মমভাবে ইতিহাসকে সম্পাদনা করে।

জীবিত একজন রাজনীতিককে সমালোচনা করা যায়, উপহাস করা যায়, ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা যায় কিংবা নির্বাচনে পরাজিত করা যায়। কিন্তু একজন মৃত রাজনৈতিক বন্দিকে স্মৃতি অনেক সময় জটিলতা থেকে মুক্ত করে দেয়। মামলার নথি হারিয়ে যায়, অভিযোগ ঝাপসা হয়ে যায়, আইনি যুক্তি মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায়।

শেষ পর্যন্ত থেকে যায় একটি ছবি—বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকার পর, পর্যাপ্ত চিকিৎসার দাবির মধ্যেই একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু। প্রতিবাদের ব্যানারে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ ব্যাখ্যা বা আইনি ফুটনোট লেখা যায় না।

এই কারণেই ইমরান খান জীবিত থাকলেও আসিম মুনিরের জন্য চ্যালেঞ্জ, আবার তার মৃত্যু ঘটলেও সেটি আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। জীবিত ইমরান খান একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। মৃত ইমরান খান হয়ে উঠতে পারেন এমন এক স্থায়ী নৈতিক অভিযোগ, যাকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি কঠিন।

এ ক্ষেত্রে শরিফ ও ভুট্টো-জারদারি পরিবারও দায় এড়াতে পারে না। তারা একদিকে গণতন্ত্র ও সাংবিধানিকতার কথা বলবে, অন্যদিকে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার সুবিধা নেবে, যার স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিষ্ক্রিয় রাখার ওপর—এই দ্বৈত ভূমিকা তারা অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যেতে পারবে না।

তারা বেসামরিক কর্তৃত্বের কথা বলে, কিন্তু রাওয়ালপিন্ডির দীর্ঘ ছায়ার নিচে ক্ষমতা পরিচালনা করে। তারা পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়কে উত্তরাধিকারের সম্পত্তির মতো বহন করে, তারপর বিস্মিত হয় কেন জনগণ নির্বাচনি রাজনীতিকে ক্রমেই সামন্ততান্ত্রিক নাট্যমঞ্চ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।

শরিফরা ক্ষমতা চায়, কিন্তু কে সেই ক্ষমতার নিশ্চয়তা দিচ্ছে তা স্বীকার করার অস্বস্তি এড়াতে চায়। ভুট্টো-জারদারি পরিবার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের দাবি রাখতে চায়, কিন্তু প্রকৃত গণতান্ত্রিক ঝুঁকি নিতে চায় না।

ফলে উভয় রাজনৈতিক পরিবারই এমন একটি ব্যবস্থার রাজনৈতিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে, যাকে তারা কখনো কখনো সমালোচনা করে, আবার বারবার তার মধ্যেই নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করে।

এই বাস্তবতায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কেবল চিকিৎসাসংক্রান্ত হস্তক্ষেপ নয়। এটি এমন একটি ব্যবস্থার ভয়াবহ দারিদ্র্যকে প্রকাশ করে, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকারও এখন বিপ্লবী দাবি বলে মনে হয়—কারণ অধিকারবঞ্চনাকেই স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে।

একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞকে ভয় পায় না। একটি আত্মবিশ্বাসী সরকার পরিবারের সঙ্গে দেখা করার অধিকার ঠেকাতে আদালতের দ্বারস্থ হয় না। একটি আত্মবিশ্বাসী সামরিক প্রতিষ্ঠান একজন ৭৩ বছর বয়সী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে সামলাতে কারাগার, মামলা, তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং বংশানুক্রমিক রাজনৈতিক সহযোগীদের প্রয়োজন বোধ করে না।

আসিম মুনিরের হাতে সেনাবাহিনী আছে। শরিফদের হাতে মন্ত্রণালয় আছে। ভুট্টো-জারদারিদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতার নিজস্ব রাজনৈতিক অংশ রয়েছে। তাদের সবার হাতে রয়েছে প্রতিষ্ঠান, নেটওয়ার্ক এবং রাষ্ট্রীয় শক্তি। কিন্তু ইমরান খানের কাছে এমন একটি জিনিস রয়েছে, যা কোনো প্রজ্ঞাপন, সাংবিধানিক সংশোধনী কিংবা নিয়োগের মাধ্যমে তৈরি করা যায় না—রাজনৈতিক অর্থ ও প্রতীকী শক্তি।

তাকে জীবিত রাখলে সেই শক্তি তাদের চ্যালেঞ্জ করবে।  তাকে, মুক্তি দিলে সেই শক্তি আবার রাজপথে ফিরে আসতে পারে। আর তাকে মরতে দিলে সেই শক্তি হয়তো তাদের সবাইকে ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত বেঁচে থাকবে। এটি কোনো সর্বময় কর্তৃত্বের ছবি নয়। এটি এক ধরনের ফাঁদ। রাওয়ালপিন্ডির ক্ষমতাকেন্দ্র এমন একজন বন্দিকে পেয়েছে, যাকে স্বস্তিতে মুক্তি দেওয়া যায় না, নিরাপদে ভেঙে ফেলা যায় না, আবার হারিয়েও ফেলা যায় না।

আর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক পরিবারগুলোরও একই কঠিন সত্য বুঝতে হবে— যখন একটি রাষ্ট্র একজন মানুষের হৃদস্পন্দন এবং সেই হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়া—দুটোকেই ভয় পেতে শুরু করে, তখন সেই বন্দিই আর কক্ষের সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তি থাকে না।

 

সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর