১০ দফা দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চের সমাবেশ, গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চের আহবায়ক , অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন নবম পে-স্কেলের আদলে গার্মেন্টস শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ১০ দফা দাবিতে আয়োজিত সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচিতে তিনি এসব কথা বলেন।
উন্নয়ন মঞ্চের সদস্য সোহেল রানা মিঠুর সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম, গার্মেন্টস দর্জি শ্রমিক কেন্দ্রের সভাপতি সাহিদা সরকার, জাতীয় গার্মেন্টস-সোয়েটার শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. রফিক, সবুজ বাংলা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ইসমাইল হোসেন ঠান্ডু, বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি রুজিনা আক্তার ও সাধারণ সম্পাদক কামরুন নাহার এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল বাছির প্রমুখ।
গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান, মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক মর্যাদাকে বিবেচনায় নিয়ে যেভাবে নবম পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে, একই মাপকাঠিতে দেশের পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। কোনো ধরনের বৈষম্যপূর্ণ বা ‘ম্যানেজ’ করা মজুরি শ্রমিকরা মেনে নেবে না।
আতিকুর রহমান বলেন, ‘ইতিমধ্যে নবম পে কমিশন ঘোষণা করেছে। নিম্ন কর্মচারীদের গুরুত্ব দিয়ে পে কমিশন দেওয়ায় আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। দেশের আশিভাগ রেমিট্যান্স সংগ্রহে যারা ভূমিকা রাখেন, তাদের মধ্যে ৫০ লাখ গার্মেন্টস খাতের নারী ও পুরুষ শ্রমিক রয়েছেন। তারা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখেন এবং বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে উঁচু করেছেন। অথচ সেই পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরাই আজ সবচেয়ে বেশি মানবেতর জীবনযাপন করেন।’
তিনি বলেন, ‘২০২৩ সালের শ্রমিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করে শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ার প্রতিবাদে গাজীপুরের শ্রমিকেরা মাঠে নামলে পুলিশের গুলিতে শ্রমিক নিহত হয়। আজও সেই হত্যার বিচার হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের শ্রম আইনের ১৩৯(৬) ধারা অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের কথা। আগামী ডিসেম্বরের আগেই মজুরি নির্ধারণ হবে অথচ এখনো মজুরি বোর্ডের বৈঠক হয়নি। তাহলে আগামী জানুয়ারি ২০২৭ সালে নতুন মজুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।’
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনতিবিলম্বে মজুরি বোর্ড গঠন করুন। আপনারা যেভাবে নবম পে-স্কেল ঘোষণা করতে গিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান, মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক মর্যাদাকে সামনে রেখেছেন, একইভাবে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এসব বিষয় বিবেচনা করে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।’
‘আগের মতো গড়পড়তা যে মজুরি নির্ধারণের প্রথা চালু হয়েছে তা ২৪-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে বৈষম্যযুক্ত কোনো ম্যানেজ করা মজুরি নির্ধারণ মেনে নেব না। কোনো গ্রুপ বা মঞ্চের কাছে আত্মসমর্পণ করে, শ্রমিকদের স্বার্থকে পাশ কাটিয়ে মজুরি নির্ধারণ করলে
—নতুন বাংলাদেশে তা করতে দেওয়া হবে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা শ্রমিকরা দেশের স্বার্থে, উন্নয়নের ক্ষেত্রে কাজ করি। শ্রমিকরা বাধ্য না হলে কখনো রাজপথে নামতে চান না। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমরা রাজপথে না এলে সরকারের কর্ণপাত হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিয়মতান্ত্রিক পন্থায়, লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে শ্রমিকদের সমস্যাগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। বাসাভাড়া বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। দেশের শ্রমিকেরা চিকিৎসা নিতে পারছেন না, সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ দিতে পারছেন না। বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের যেভাবে সমান সুযোগের কথা বলেছে, সেই আলোকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।’
শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিগত ছয় মাসে কারখানা থেকে ৫০ হাজার শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। আমরা দাবি জানাচ্ছি, অনতিবিলম্বে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে এবং বন্ধ কল-কারখানাগুলো চালু করতে হবে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘মালিকপক্ষ কালো তালিকা করে শ্রমিকদের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনতিবিলম্বে এই কালো তালিকাকরণ বাতিল করতে হবে।তা না হলে বিজিএমইএ ভবনে মার্চ করা হবে।’
শ্রম আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানিয়ে আতিকুর রহমান বলেন, ‘ মামলা চলে বছরের পর বছর। একজন শ্রমিক বৃদ্ধ হয়ে যান, কিন্তু মামলা নিষ্পত্তি হয় না। একজন শ্রমিক মামলা করে পাবেন দুই লাখ টাকা, অথচ মামলা শেষ করতে সময় লাগে ১০ বছর। মামলা সংক্ষিপ্ত পরিসরে দ্রুত শেষ করে কীভাবে শ্রমিকের পাওনা মজুরি আদায় করা যায়, সে পদক্ষেপ নিতে হবে।’
কল-কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে বিভিন্ন কল-কারখানায় বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ না থাকায় কারখানা বন্ধ এবং শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারকে নজর দিতে হবে।’
গার্মেন্টস খাতে মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীরা ছয় মাস ছুটি পান গার্মেন্টস সেক্টরেও মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করতে হবে।’
‘কোনো প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন করতে গেলেই শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হয় এবং হয়রানি করা হয়। অনতিবিলম্বে তা বন্ধ করতে হবে।’
সবশেষে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন,আগামী সাতদিনের মধ্যে ‘মজুরি বোর্ড গঠন না হলে শ্রমিকদের নিয়ে বৃহৎ আঙ্গিকে আন্দোলন করা হবে।’
বার্তা প্রেরক
আতাউর রহমান
সিনিয়র রিপোর্টার