NEWSTV24
চলমান সার সংকট নিয়ে সংসদে বিতর্ক, কী বলছে সরকারি-বিরোধী দল
বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৫৬ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

সারাদেশে কৃষকদের মধ্যে সার নিয়ে হাহাকার চলছে বলে জাতীয় সংসদে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, সারের সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় সংকট রয়েছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সার মজুত আছে এবং নতুন পরিবেশক নিয়োগসহ সংকট মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।সার সংকট নিয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমানের নোটিশের ওপর আলোচনায় বুধবার দুপক্ষের এ বিতর্ক হয়।দেশজুড়ে তীব্র সার সংকটে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়া; কৃষকদের মাঝে বিরাজমান আতঙ্ক এবং সম্ভাব্য খাদ্য সংকটের ঝুঁকি নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ বিষয়ে আলোচনার জন্য কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধিতে নোটিশটি দেন বিরোধী দল জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান।ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে ইঙ্গিত করে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, স্বৈরাচার সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া অনেক পরিবেশক (ডিলার) এখনও বহাল রয়েছেন, অনেকে পলাতক। এখনও প্রায় তিন হাজার ৭৫৯টি সারের ডিলার পয়েন্ট শূন্য। বিতরণে যাতে সমস্যা না হয়, সেজন্য প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে নতুন ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচার আমলে নিয়োগ পাওয়া ডিলাররা সরকারকে হেয় করার চেষ্টা করছে। কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। এটি আর করতে পারবে না।

কী বলছে সরকারি-বিরোধী দল

ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি সারের মজুতের পরিসংখ্যান তুলে ধরে মীর শাহে আলম বলেন, গত বছর মজুত অনেক কম ছিল। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সারের দাম অনেক বেশি। এই কারণে কিছু সার সেখানে পাচার হওয়ার প্রবণতার তথ্য প্রশাসনের কাছে রয়েছে। এ রকম দুটি ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথাও জানান তিনি।প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার আছে বলেই কৃষকরা আগামী মৌসুমের জন্য সার কিনতে পারছেন। এটা মাথায় রেখেই কৃষি বিভাগ ও সরকার প্রতি জেলায় অতিরিক্ত সার মজুত রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেছে।জামায়াতের আরেক সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, সারে নাকি পুরো দেশ ভাসছে। অথচ গণমাধ্যমের খবর, ন্যায্যমূল্যের চেয়েও বেশি টাকা দিয়ে সার পাচ্ছেন না কৃষক। সার সংকটের মধ্যে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত গুদাম ভর্তি এমন অভিযোগ তুলে শফিকুল ইসলাম বলেন, আবার সেই ২০০১-২০০৬ সালের প্রবণতা। যখন এক বস্তা সারের জন্য কৃষককে গুলির মুখে জীবন দিতে হয়েছে।

কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুল আলম বলেন, চলমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। সরকারের তথ্যমতে, সারের অতিরিক্ত মজুত আছে। তবে কৃষকরা সার পাচ্ছে না কেন এবং কেন তাদের কালোবাজারে যেতে হচ্ছে?কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও রৌমারীতে কৃষকদের সার লুটপাটের ঘটনা এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় সারের জন্য কৃষকদের অসন্তোষের কথাও সংসদে তুলে ধরেন মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, কৃষকদের মধ্যে যে হাহাকার তৈরি হয়েছে, তা সরকারের ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। কালোবাজারি রোধ, ডিলারদের সিন্ডিকেট ভাঙা এবং কৃষকের কাছে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ।নোটিশদাতা নাজিবুর রহমান বলেন, তারা সরকারের কথা বিশ্বাস করতেই চান। কিন্তু এখানে একটা সমস্যা আছে। জ্বালানি সংকট যখন শুরু হলো তখনও বলা হয়েছিল, দেশে কোথাও লোডশেডিং নেই। এখন কি আমরা উনাদের বিশ্বাস করব, নাকি অবিশ্বাস করব?

তিনি বলেন, সরকারের সাফল্য এবং ব্যর্থতা তার ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। সরকার সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। সার কারখানাগুলোকে বন্ধ রেখে বেশি দামে জনগণের টাকায় সার কেনে, বলা হচ্ছে মজুত আছে ঠিকই আছে, কিন্তু এটা কৃষকের হাতে পৌঁছাতে পারছে না কেন? এটাই সরকারের ব্যর্থতা। জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকটে যা লক্ষ্য করা গেছে, সারের সংকটের ক্ষেত্রেও একই বিপর্যয় ঘটছে।মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, সার ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে অনেক কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ৬৪টি জেলায় ৬৪টি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দুজন যুগ্ম সচিব ও দুজন উপসচিবের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের ডিলারদের পরিবর্তনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন শূন্য পদে ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, যার আবেদনের শেষ তারিখ আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার)। কিন্তু আবেদনের সময় শেষ হওয়ার আগেই অহেতুক অনিয়মের অভিযোগ তোলা অবান্তর।

তিনি বলেন, পত্রপত্রিকায় আসা সার-সংক্রান্ত ২০-২২টি বিশেষ এলাকার ছোটখাটো সমস্যাগুলোকে ভিত্তি করে অসন্তোষ ছড়ানোর অপচেষ্টা চলছে।প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমানে দেশে সারের মোট পরিমাণ ৫১ দশমিক ৭১ লাখ টন, যা চাহিদা মেটানোর পরও ১৫ দশমিক ৮৪ লাখ টন উদ্বৃত্ত থাকবে।শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য তুলে ধরে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শরিফুল আলম বলেন, দেশে পর্যাপ্ত সার উৎপাদন, আমদানি ও মজুত রয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন উৎপাদিত ও আমদানি করা সার কারখানা ও বাফার গুদামে রাখে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী তা পরিবেশক পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে বিসিআইসির সাতটি সার কারখানার মধ্যে ঘোড়াশাল-পলাশ এবং শাহজালাল সার কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড গ্যাস পাওয়ার পর উৎপাদন শুরুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে।প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম বলেন, সংকট তীব্র নয়, সার আছে। ব্যবস্থাপনায় কিছু ত্রুটি থাকতে পারে।