NEWSTV24
এবার শীত দেরিতে, কমবে তীব্রতা
শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬ ১১:২৭ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

এবার দেশে শীত আসতে পারে কিছুটা দেরিতে। শুধু তাই নয়, শীতের আয়ুও কম হতে পারে। তীব্রতাও গত কয়েক বছরের তুলনায় কম থাকার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে চলতি শীত মৌসুমে দেশের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা কম। তবে বৃষ্টিপাত কম হলে ঘন কুয়াশার প্রকোপ বাড়তে পারে।আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের আগাম আভাস ইতোমধ্যে মিলতে শুরু করেছে দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে। মধ্যরাতের পর ঠান্ডার অনুভূতি বাড়ছে। ভোরে দেখা যাচ্ছে কুয়াশা ও শিশির। তবে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় এখনও শীতের আমেজ তেমন অনুভূত হচ্ছে না। বরং দিনের বেলা অনেক জায়গায় ভ্যাপসা গরম রয়েছে।আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আজ শুক্রবারের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিতে পারে। এর মধ্য দিয়ে বর্ষার আনুষ্ঠানিক বিদায় ঘটবে। কিন্তু মৌসুমি বায়ুর বিদায়ের পরপরই শীত নেমে আসবে, এমনটা নয়। অক্টোবরজুড়ে আবহাওয়ার পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটতে পারে। নভেম্বরের শেষভাগ থেকে শীতের অনুভূতি আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন নেসা বলেন, এবার এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা বেশি থাকবে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ফলে এবার শীতের মেয়াদ কম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শীত কম হলেও ঘন কুয়াশা বাড়তে পারে। এরই মধ্যে নদী অববাহিকা অঞ্চলে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে।

এল নিনোর প্রভাব

এবারের শীতের চরিত্র বদলে যেতে পারে এল নিনোর প্রভাবে। প্রশান্ত মহাসাগরের এই প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়ার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশে না পড়লেও বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে এর প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ায় পৌঁছাতে পারে।আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, জুনের পর থেকেই এল নিনোর শক্তিশালী অবস্থা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশে নয়, পুরো ভারতীয় অঞ্চলে পড়তে পারে। শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে গ্রীষ্মে অনিয়মিত বৃষ্টি ও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা দেখা দিতে পারে। শীতেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের পূর্বাভাসে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার ইঙ্গিত রয়েছে। একই সময়ে বৃষ্টিও কম হতে পারে। কয়েক দফায় শৈত্যপ্রবাহ হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বাংলাদেশে শীতকালে তাপমাত্রা সাধারণত স্থানভেদে ১২ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। উত্তরাঞ্চলে তা ১২ থেকে ১৬ ডিগ্রিতে নেমে আসতে পারে। এবার গড় তাপমাত্রা ১৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে। একটানা দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহের পরিবর্তে স্বল্পস্থায়ী ও বিচ্ছিন্ন শৈত্যপ্রবাহ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শৈত্যপ্রবাহের দিনসংখ্যা কম হলেও কোনো কোনো সময়ে তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে।তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলে রাতে পরিষ্কার আকাশ, হালকা বাতাস ও কুয়াশার পরিস্থিতিতে তাপমাত্রা দ্রুত কমে যেতে পারে। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই তীব্র শীতের অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশে সাধারণত অক্টোবরের শেষ দিক থেকে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। নভেম্বরের শেষভাগে উত্তরের হিমেল বাতাসের প্রভাব বাড়ে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকে শীতের মূল সময়। তবে এবারের পরিস্থিতিতে অক্টোবরজুড়ে দিনের বেলা গরম থাকার পর ধীরে ধীরে শীতের দিকে এগোতে পারে দেশ। শীত কমার দীর্ঘমেয়াদি ইঙ্গিত শীতের পূর্বাভাসের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবণতাও মিলছে। নরওয়ের মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদন দ্য ফিউচার ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ -এ ভবিষ্যতে দেশে শীতের ব্যাপ্তি কমে যাওয়ার প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে।গবেষণায় ১৯৮৫-২০১৪ সময়কে ঐতিহাসিক ভিত্তি ধরে ২০৪১-২০৭০ এবং ২০৭১-২১০০ সময়ের সম্ভাব্য জলবায়ু পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, শতাব্দীর শেষে শীতকালে দৈনিক গড় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।

কৃষিতেও পড়বে প্রভাব

শীতের আয়ু ও তীব্রতা কমে গেলে কৃষিতেও এর কিছু প্রভাব পড়তে পারে। শীতকালীন অনেক ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ফলনের জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার ঠান্ডা প্রয়োজন। তাপমাত্রা বেশি থাকলে কিছু ফসলের চাষের সময়সূচি ও ফলনে পরিবর্তন আসতে পারে। অন্যদিকে, বৃষ্টি কমে গেলে মাটির আর্দ্রতা কমতে পারে। এতে শীতকালীন ফসল এবং পরবর্তী বোরো ধানে সেচের প্রয়োজন বাড়তে পারে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার বৃষ্টি কম হলেও ঘন কুয়াশা হলে শীতকালীন সবজি, আলুসহ কিছু ফসলে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে কোন ফসলে কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে অঞ্চল, তাপমাত্রা, মাটির আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও কুয়াশার স্থায়িত্বের ওপর।শীতের ব্যাপ্তি কমে যাওয়ায় কৃষিতে কী প্রভাব পড়ছে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মঞ্জুরুল কাদির বলেন, প্রতিটি ফসলের একটা নির্ধারিত তাপমাত্রার স্তর থাকে। শীতকালীন ফসলগুলোর জন্য (আলু, গম, ভুট্টা, সরিষা, টমেটো প্রভৃতি) তাপমাত্রা ১০ থেকে ১২ বা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে টানা প্রায় আড়াই মাস থাকতে হয়। এই সময়ের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে সব ফসলের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন কমে আসবে।তিনি বলেন, তাপমাত্রা বেড়ে গেলে ফসলটি দ্রুত পরিণত হয়ে যায়। তখন এর ফলন কমে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তী মৌসুমে ধীরে ধীরে কৃষক ওই ফসলের আবাদ থেকে সরে আসে। আর এ কারণে দেশে গমের উৎপাদন কমে গেছে।