NEWSTV24
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে পিছিয়ে বাংলাদেশ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে পিছিয়ে বাংলাদেশ
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ অপরাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

রোনা মহামারির কারণে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ক্ষতির মুখে পড়ে। তিন দশক পর ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নামে। করোনা সংক্রমণ কমে গেলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু তা টেকসই হয়নি। অর্থনীতি আবার নিম্ন প্রবৃদ্ধির ধারায় চলে গেছে। 

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অর্থনীতির ধীরগতির সঙ্গে চার বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে পাকিস্তান ছাড়া বাংলাদেশের মতো নাজুক পরিস্থিতিতে কেউ নেই। নিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক দাম নিম্ন আয়ের মানুষকে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে। এতে করে প্রকৃত আয় কমে দারিদ্র্যের হার আবার বাড়ছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ধীরগতি থাকায় বেকারত্ব বাড়ছে। 

আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং এডিবি– তিনটি প্রধান আন্তর্জাতিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক পর্যালোচনা এমনটাই বলছে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হয়ে আশির দশকের পর্যায়ে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে, যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অর্থনীতির মধ্যে সর্বনিম্ন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, তীব্র গণআন্দোলন এবং একটি জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ব্যবসায়ী মহলেও আশার সঞ্চার হয়েছিল, দেশের অর্থনীতি দ্রুত স্থবিরতা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বলছে, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর ও বিধ্বস্ত অর্থনীতির ক্ষত কাটিয়ে স্বাভাবিক ধারায় ফেরাতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।

উন্নয়ন সহযোগীরা আশা করেছিল, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে চলতি এবং আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কিছুটা হলেও ইতিবাচক গতি পাবে। সে অনুযায়ী তারা আগের চেয়ে বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও দিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি সবাই আগের পূর্বাভাসের নিম্নমুখী সংশোধন করেছে। 

বিশ্বব্যাংকে চলতি মাসে ‘সাউথ এশিয়া ইকোনমিক আপডেট’ নামে এই অঞ্চলের অর্থনীতির ওপর হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশে। এর আগের পূর্বাভাসের তুলনায় সংস্থাটি এক ধাক্কায় প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম বাংলাদেশ, যার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা ক্রমাগত নিম্নমুখী হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অতি সম্প্রতি ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি অনুমান করেছে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ। আইএমএফ মনে করছে, পরের তিনটি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নামবে। ২০৩০-৩১ অর্থবছরে গিয়ে ৩ শতাংশ হতে পারে। 
গত মাসে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রকাশিত ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’-এ বলা হয়, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ শতাংশ। এর মাত্র দুই মাস আগে সংস্থাটি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। 

তিন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান। বৈশ্বিক প্রতিকূলতা ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি খুব একটা ব্যাহত হয়নি। বরং ভারতসহ অন্যান্য দেশের জোরালো অগ্রগতির ওপর ভর করে দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৬ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাবে বলে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে।

প্রতিবেশী ভারত যেখানে শ্রম আইন সংস্কার, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশের জোরে ৭ শতাংশের বেশি গতিতে বাড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হওয়া নেপালের প্রবৃদ্ধিও বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। এমনকি কয়েক বছর আগে চরম ঋণ সংকটে দেউলিয়া হওয়ার পর বর্তমানে শ্রীলঙ্কাও ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

উন্নয়ন সহযোগীদের পর্যালোচনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হলো– উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে ধীরগতি, ব্যাংকিং খাতে সংকট, রপ্তানিতে একক পণ্যের ওপর নির্ভরতাসহ বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং তীব্র আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মুখে বাংলাদেশের শিল্পোৎপাদনের গতি কমেছে।

বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফের একযোগে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক মনে করছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশ বর্তমানে যে ৩ শতাংশের প্রবৃদ্ধির বৃত্তে আটকে পড়ছে, আশির দশকে দেশের অর্থনীতি ঠিক এমন দশায় ছিল। ওই দশকে নিম্ন প্রবৃদ্ধির কারণে দেশে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য বেড়েছিল।

সাবেক গভর্নর বলেন, আশির দশকে বাংলাদেশ চরম দরিদ্র আফ্রিকান দেশগুলোর মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি ছিল এবং বিশ্বের দ্বিতীয় দরিদ্রতম দেশ হিসেবে বিবেচিত হতো। সেখান থেকে দীর্ঘ লড়াই করে অর্থনীতিকে একটি সম্মানজনক জায়গায় তুলে আনা হয়েছিল। এখন আবার কেন বাংলাদেশ সেই অন্ধকার অতীতে ফেরত যাবে–সেই প্রশ্ন তুলে তিনি একে দেশের ‘অসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক রূপান্তর’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

অর্থনীতির রক্তক্ষরণের বড় কেন্দ্রবিন্দু দেশের ব্যাংক খাত উল্লেখ করে আহসান এইচ মনসুর বলেন, সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি টাকা নিয়ে নিচ্ছে। ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমছে। ব্যাংকগুলোও এখন বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে সরকারকে ঋণ দিতেই বেশি আগ্রহী। 

ব্যাংক খাতে অতীতে শুরু হওয়া কাঠামোগত সংস্কারের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে না পারায় আক্ষেপ প্রকাশ করেন ড. মনসুর। তিনি বলেন, গভর্নর হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়কালে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে বেশ কয়েকটি নতুন আইন ও নীতি সংস্কার করা হয়েছিল। যার ফলে সংকটে পড়া ইসলামী ব্যাংক পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। পরবর্তী সময় সেই সংস্কারের অগ্রগতি ধরে রাখা যায়নি; বরং ব্যাংক খাতকে পুনরায় পুরোনো অব্যবস্থাপনা ও দুর্বলতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি অর্থনীতিতে ‘বিষফোড়ায়’ রূপ নিয়েছে। অতীতের তুলনায় এর প্রকোপ কমেনি, বরং বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

দেশের অর্থনীতি এর সহ্যক্ষমতা হারিয়েছে বলে মনে করেন ড. মনসুর। একটি রূপক দিয়ে বোঝান এভাবে, একটি স্বাস্থ্যবান শরীর থেকে রক্ত চুষে নিলেও সে হয়তো কিছু সময় টিকে থাকতে পারে, কিন্তু শরীর যখন রোগাক্রান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন আর তা সইতে পারে না। অতীতে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির ক্ষতি কিছুটা সহ্য করতে পারলেও, বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতি সেই ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে। 

আহসান মনসুর আরও বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও উচ্চ পরিচালন ব্যয়ের কারণে দেশীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। অনেকে ভিনদেশে ব্যবসা সরিয়ে নিচ্ছেন বলে তিনি শুনছেন। দেশীয় উদ্যোক্তাদের এই গুটিয়ে নেওয়া এবং মূলধন বাইরে চলে যাওয়া অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

প্রতিযোগী দেশগুলোর অগ্রগতির উদাহরণ টেনে ড. মনসুর বলেন, ভারত, চীন, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়া যে গতিতে এগোচ্ছে, বাংলাদেশ তা পারছে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ওই দেশগুলো রাজনৈতিক মতাদর্শকে একপাশে সরিয়ে অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশে এখনও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অর্থনৈতিক রূপান্তর বারবার হোঁচট খাচ্ছে।

বর্তমান সরকারের আট মাস পার হয়ে গেলেও অর্থনৈতিক নীতিতে দৃঢ় সূচনার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন আহসান মনসুর। সুশাসন ও কঠোর সংস্কার ছাড়া মুক্তি নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে হলে আর্থিক খাত, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসনের জন্য কঠোর সংস্কার আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে এবং এক পর্যায়ে ধ্বংসের মুখে গিয়ে ঠেকবে।

বৈশ্বিক সংকটে সবাই, তবুও মূল্যস্ফীতিতে শীর্ষে বাংলাদেশ

বৈশ্বিক যেসব সংকট বাংলাদেশ এখন মোকাবিলা করছে, তা অন্যদের জন্যও বড় সমস্যা। এমন অবস্থার মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক গড় মূল্যস্ফীতি যেখানে কমছে, সেখানে উল্টোপথে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এখানে মূল্যস্ফীতি শুধু বেশিই নয়, বরং তা আরও বৃদ্ধির আভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো।

এডিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার গড় মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে কমে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে এবং ২০২৭ সালে আরও কমে ৪ দশমিক ৮ শতাংশে নামবে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে চলতি অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ৯ শতাংশে পৌঁছাবে।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি চলতি অর্থবছরে ৮ দশমিক ৬ শতাংশে অবস্থান করবে। আইএমএফ সবচেয়ে উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থাটির সর্বশেষ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘর ছাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকতে পারে। 

প্রতিবেশীদের চিত্র অনেকটাই স্বস্তিদায়ক। ভারতে মূল্যস্ফীতি ২০২৬ অর্থবছরে ৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৭ অর্থবছরে ৪ শতাংশে নেমে আসবে। পর্যটননির্ভর মালদ্বীপে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ভর্তুকির কারণে তা কমে ২০২৬ সালে ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ২ শতাংশে নামবে। নেপালে ২০২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল মাত্র ৩ দশমিক ১ শতাংশ। এমনকি বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া শ্রীলঙ্কায়ও মূল্যস্ফীতি কমে ২০২৭ সাল নাগাদ ৫ দশমিক ২ শতাংশে নামার পূর্বাভাস রয়েছে। 

প্রশ্ন উঠেছে– বৈশ্বিক অভিঘাত যখন সবার জন্য সমান, তবু বাংলাদেশ কেন বেশি চাপের মধ্যে। উন্নয়ন সহযোগীরা এ জন্য আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বহুমুখী সংকটকে দায়ী করছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো যতটা দক্ষতার সঙ্গে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করছে, ততটা পারছে না বাংলাদেশ। ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা থেকে বের হতে পারছে না। দুর্নীতিকে বাগে আনতে পারছে না। কর আদায় বাড়াতে না পারলেও পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে চলেছে এবং প্রশ্নসাপেক্ষ বিশাল ব্যয় বরাদ্দ নিয়ে মেগা প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। ভোগ্যপণ্যে সিন্ডিকেট ভাঙতে পারছে না, আবার সরকার নিজেও বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ অত্যাবশ্যকীয় পরিসেবার ব্যয় বাড়িয়ে নিজেই মূল্যস্ফীতি উস্কে দিচ্ছে।

প্রতিবেশী দেশগুলো সমন্বিত নীতিগত সুরক্ষার মাধ্যমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। যেমন– জ্বালানির দাম বাড়লেও সরকার অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর আবগারি শুল্ক কমিয়েছে ভারত। পাশাপাশি খাদ্যশস্যের বড় সরকারি মজুত ব্যবহার করে খাদ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। 

মালদ্বীপ সরাসরি জাতীয় বাজেট থেকে জ্বালানি ও বিদ্যুতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি অব্যাহত রেখে ভোক্তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা পড়তে দেয়নি। শ্রীলঙ্কা তীব্র সংকটের মুখেও কিউআর কোডের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট জ্বালানি রেশনিং এবং কঠোর আর্থিক নীতি প্রয়োগ করে বাজার স্থিতিশীল করেছে।

ব্যবসায়ীরা যা বলছেন 

অর্থনীতির বর্তমান নিয়ে সমকালের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী। শিল্পগোষ্ঠী এসিআই লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও এমিসিসিআইর সাবেক সভাপতি এম. আনিস উদ দৌলা বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল বলে অভিহিত করেন। তিনি মনে করেন, সংকট উত্তরণে সব পক্ষের সহনশীলতা ও ধৈর্য প্রয়োজন।

আনিস উদ দৌলা বলেন, ‘আমরা একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি পার করে এসেছি। এখন সবাই রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান চায়, কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব নয়। দেখতে পাচ্ছি, সবার সহনশীলতা কমে গেছে। সরকারকে সময় দিতে হবে, যৌক্তিক সময় না দিলে কোনো সরকারই কাজ করতে পারবে না।’

তিনি বলেন, এখন সবচেয়ে বেশি দরকার রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সবার মধ্যে সহনশীলতা। তরুণরা যারা দায়িত্বে এসেছেন, তারা হয়তো অনেক ভালো ও সৎ, তবে অনভিজ্ঞ। প্রথম দিন থেকেই সবকিছু দাবি করার যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তা থামাতে হবে।

ব্যবসায় নতুন বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, মূলধনের ঘাটতি এবং বড় বড় অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ব্যবসা সম্প্রসারণ শ্লথ হয়ে পড়েছে; তবে দেশীয় উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে এই সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করতে হবে।

মাঠ পর্যায়ের বাস্তব সংকট ও অতীতের অনিয়ম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের এক বড় শীর্ষ শিল্পপতি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নিয়ে তিনি বিচলিত নন। কারণ, সংস্থাগুলো সময়ে সময়ে একেক কথা বলে। 

এই শিল্পোদ্যোক্তা বলেন, বিগত ১৭ বছরের এক ভয়ংকর লুটের ‘লিগ্যাসি’ থেকে আমরা ব্যবসাটা পেয়ে আসছি। শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখনও টিকে আছে, এটাই তো অলৌকিক ব্যাপার। মার্কেট থেকে দুই লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে, অলিগার্করা ব্যাংক ও আর্থিক খাত ফাঁকা করে দিয়েছে। এই সত্য তো কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।

উন্নয়ন সহযোগীরা যা করতে বলছে

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসা নতুন সরকারের জন্য এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা। প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার করতে হবে। ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট দ্রুত পুনর্গঠন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে বিনিয়োগ চাঙ্গা হবে না। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঘন ঘন ধর্মঘট ও পথ অবরোধ বন্ধ করে নীতি ও পরিচালন পরিবেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে।