দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতা নিরসন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত এবং শিল্পকারখানা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে সরকারের প্রতি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর রিপোর্টাস ইউনিটি, শফিকুল কবির মিলোনায়াতন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এডভোকেট আতিকুর রহমান।
কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লসকর মোঃ তসলিমের সঞ্চালনায় সম্মেলন আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি হারুনুর রশিদ খাঁন, কবির আহমদ, সহ-সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম, মাওলানা মহিবুল্লাহ, কোষাধক্ষ্য আজহারুল ইসলাম, ট্রেড ইউনিয়ন বিষয়ক সম্পাদক সোহেল রানা মিঠু, বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কামরুন নাহার,গার্মেন্টস দর্জি শ্রমিক কেন্দ্রীয় সভাপতি সাহিদা সরকার প্রমুখ। লিখিত বক্তব্যে আতিকুর রহমান বলেন, দেশের তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকায় শ্রমিকেরা পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। এ অবস্থায় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ যৌক্তিক দাবিতে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে।
তিনি বলেন, সরকার গত ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, বাজারদর ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বোর্ডকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সুপারিশ দিতে হবে। শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে দ্রুত নতুন মজুরি ঘোষণা করতে হবে।
শিল্পকারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, যানবাহনে হামলা ও উৎপাদন ব্যাহত করার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আতিকুর রহমান বলেন, শ্রমিকের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং শিল্প ধ্বংসের অপতৎপরতা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবির প্রতি তাঁদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তবে কোনো কারখানা কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে মালিক বা শ্রমিক—কোনো পক্ষই লাভবান হবে না। এতে শ্রমিকেরা কর্মসংস্থান হারাবেন, মালিকেরা বিনিয়োগ হারাবেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাতীয় অর্থনীতি।
তিনি আরও বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পেছনে কোনো নিষিদ্ধ স্বৈরাচারী সংগঠন কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে। শ্রমিক অসন্তোষকে পুঁজি করে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে ধ্বংসের অপচেষ্টা প্রতিহত করতে হবে। একই সঙ্গে সহিংসতা ও নাশকতায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, গত ৩ নভেম্বর মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন চলাকালে তৌফিক শেখ (২১) নামে এক পোশাকশ্রমিক গুরুতর আহত হয়ে পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থাও করতে হবে। পাশাপাশি শ্রম অসন্তোষকে কেন্দ্র করে নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তার, হয়রানি এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা তথ্যে বলা হয়, চলমান শ্রম অসন্তোষের কারণে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরের শুরু থেকে বিভিন্ন সময়ে ৫০০ থেকে ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে অথবা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বুধবার দুপুর ১টা পর্যন্ত ৩০৬টি কারখানা বন্ধ ছিল। এর মধ্যে গাজীপুরে ১৬১টি, আশুলিয়ায় ৯৩টি এবং মিরপুরে ৫২টি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার প্রায় সাত লাখ শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ৪৫৭টি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
আতিকুর রহমান বলেন, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদেশি ক্রয়াদেশ বাতিল, সময়মতো পণ্য রপ্তানিতে ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শ্রমিক ও মালিককে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নয়, বরং পারস্পরিক আলোচনা, আস্থা ও সমঝোতার ভিত্তিতে সংকটের সমাধান করতে হবে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হলে তাঁদের জীবনমান উন্নত হবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং শিল্পে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
সংবাদ সম্মেলনে ১৪ দফা দাবি
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ১৪ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করা; তৌফিক শেখ হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি; আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা; ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, নাশকতা ও সহিংসতায় জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ, গ্রেপ্তার করা নিরপরাধ শ্রমিক ও নেতাদের মুক্তি, শ্রমিকদের নামে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং রাজনৈতিক পরিচয়ে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতন বন্ধের দাবি জানানো হয়।
অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে—শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শ্রমিক-মালিক ও সরকারের মধ্যে দ্রুত ত্রিপক্ষীয় সংলাপ আয়োজন, আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ সংগঠন ও স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র এবং উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়া, অন্যায় ও বেআইনি শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ, কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের পুনরায় কাজের সুযোগ সৃষ্টি, বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা।
দাবির শেষ পর্যায়ে পোশাকশিল্প ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থান রক্ষা এবং দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে শ্রমিক, মালিক ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শিল্পের সুরক্ষা পরস্পরবিরোধী নয়। শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে দেশের অর্থনীতি বাঁচবে। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে শিল্পের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা সম্ভব নয়, আবার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমেও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
তিনি সরকার, পোশাকশিল্পের মালিক, শ্রমিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ন্যায়ভিত্তিক শ্রমব্যবস্থা গঠন এবং দেশের শিল্পের স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন দায়িত্বশীল ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।
আতাউর রহমান
সিনিয়র রিপোর্টার