NEWSTV24
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো নারীদের ৩৮% অন্তঃসত্ত্বা
শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬ ১১:৫১ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

মিঠুন চৌধুরী ও অর্পিতা দাশের বিয়ের এক বছরও হয়নি। ঘরে নতুন অতিথি আসার অপেক্ষায় ছিলেন এ দম্পতি। অনাগত সন্তানকে বরণ করতে নিচ্ছিলেন নানা প্রস্তুতি। কিন্তু সেই আনন্দের পরিণতি হলো ভয়াবহ শোক। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৬ বছর বয়সী অর্পিতার মৃত্যু হয়। বাঁচানো যায়নি তাঁর গর্ভের সন্তানকেও। এক ডেঙ্গুতে তছনছ মিঠুনের সাজানো সংসার।অর্পিতা একা নন। চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও সাত অন্তঃসত্ত্বা নারী প্রাণ হারিয়েছেন। এর বাইরে কয়েকজন প্রসূতিও রয়েছেন। তারা দুগ্ধপোষ্য শিশুকে মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত করে চলে গেছেন। তাদের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে পরিবারগুলো।অর্পিতার জেঠাতো ভাই শাওন দাশ বলেন, বোনের প্রথম সন্তান হওয়ার কথা ছিল। এ নিয়ে পরিবারের সবার কত স্বপ্ন ছিল। কিন্তু ডেঙ্গুর কারণে সন্তানসহ বোনকে হারাতে হলো। মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে হয়তো এমন পরিণতি এড়ানো যেত।চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৫৪১ জন। মারা গেছেন ৪০ জন। তাদের মধ্যে ২১ জন নারী। এর মধ্যে আটজন অর্থাৎ, ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। মারা গেছে তাদের গর্ভের শিশুরাও।চলতি মাসের প্রথম ছয় দিনে ৪৬৭ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই ছয় দিনে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল ৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। অক্টোবরে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৬০৮ জন। সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪৩০।এক মাসের শিশু রেখে চলে গেলেন রিমি এক মাস আগে দ্বিতীয়বার মা হন রাশেদা বেগম রিমি (২৯)। সন্তান জন্ম নেওয়ায় আনন্দে ভরে উঠেছিল রিমি ও আমিরুল হোসেন দম্পতির পরিবার। তাদের সাড়ে চার বছর বয়সী আরেকটি ছেলে রয়েছে। দুই সন্তানকে নিয়ে ভালোই কাটছিল দিন।

কিন্তু সেই সুখ স্থায়ী হয়নি। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান রিমি। তাঁর মৃত্যুতে দুই সন্তান মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত। দুই সন্তান নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে পরিবারটি।পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ সেপ্টেম্বর রিমির শরীরে তীব্র জ্বর দেখা দেয়। পরদিন ডেঙ্গু পরীক্ষায় ফল পজিটিভ আসে। ৫ সেপ্টেম্বর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুদিনের মধ্যে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। দ্রুত কমতে থাকে রক্তের প্লাটিলেট। চিকিৎসকদের চেষ্টা ব্যর্থ করে একপর্যায়ে মারা যান তিনি।সন্তান জন্মের আগেই থেমে গেল জীবন ডেঙ্গুতে গর্ভের সন্তানসহ প্রাণ হারিয়েছেন আনিসা দাশ মলি (৩০)। তাঁর চার বছর বয়সী মেয়ে মৈত্রী সরকার এখন মাহারা। ১৭ নভেম্বর মলির দ্বিতীয় সন্তান জন্মের সম্ভাব্য তারিখ ছিল। দুর্গাপূজার আনন্দ আর নতুন অতিথিকে বরণ করার প্রস্তুতিতে দিন কাটছিল পরিবারের সদস্যদের।কিন্তু হঠাৎ জ্বরে সব আনন্দ ম্লান হয়ে যায়। গত ২০ অক্টোবর জ্বরে আক্রান্ত হন মলি। পরদিন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গর্ভে সন্তান থাকায় সতর্কতার সঙ্গে চলছিল চিকিৎসা। কিন্তু অবস্থার অবনতি হওয়ায় ২৫ অক্টোবর তাঁকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানেই মারা যান মলি। মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে গর্ভের সন্তানকেও হারায় পরিবার। স্বামী রাজীব সরকারের সংসারে নেমে আসে গভীর শোক।মলির চাচাতো ভাই শুভ্র দাশ বলেন, সবার কাছে প্রশ্ন, কেন এমন শাস্তি পেতে হলো তাদের? ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা যাদের দায়িত্ব, তারা কি সেই দায়িত্ব এড়াতে পারেন?

গর্ভাবস্থায় কেন বেশি ঝুঁকি চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ও গাইনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মুসলিনা আখতার বলেন, গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে মা ও গর্ভস্থ সন্তানের গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ সময় নারীর শরীরে নানা শারীরিক ও হরমোনগত পরিবর্তন ঘটে। এতে সংক্রমণ জটিল আকার ধারণ করতে পারে।ডা. মুসলিনা আরও বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে রক্তের প্লাটিলেট দ্রুত কমে যেতে পারে। প্রসবের আগে বা প্রসবের সময় গুরুতর অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের ঝুঁকিও থাকে। এতে মা ও শিশুর জীবন বিপন্ন হতে পারে।চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক। এর মধ্যে কয়েকজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর মৃত্যু হয়েছে। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাদের বিশেষ সতর্কতা ও চিকিৎসা প্রয়োজন। ডেঙ্গুর প্রকোপের সময় দিনের বেলায়ও মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ডেঙ্গুতে একটি প্রাণহানিও কাম্য নয়। হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা সম্ভব। কিন্তু একটি জীবন চলে গেলে তা ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। এ জন্য জনসচেতনতা জরুরি।