পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধ ২০৪ কোটি ডলারঢাকার বাতাস ‘অস্বাস্থ্যকর’ক্ষতের ওপর আরেক আঘাত: বন্যায় বিপর্যস্ত নেপালে এবার ভূমিকম্প!নবম পে-স্কেল: শিগগিরই গেজেট প্রকাশমাধ্যমিকের সব শিক্ষকদের জন্য মাউশির জরুরি নির্দেশনা
No icon

রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হলে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়বে

রোহিঙ্গা সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, বাংলাদেশে এর মানবিক ও নিরাপত্তাঝুঁকি তত বাড়বে। শুধু মানবিক সহায়তায় এ সংকট সামাল না দিয়ে প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করতে হবে। এ জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পক্ষগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করা প্রয়োজন।রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর রমনায় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় এমন অভিমত উঠে আসে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস বিস) মিলনায়তনে রোহিঙ্গা সংকট: নতুন চ্যালেঞ্জসমূহ এবং টেকসই কৌশল শীর্ষক এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এর আয়োজন করে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কো অপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ)।প্রধান অতিথির বক্তৃতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধান যত দেরি হবে, তত বেশি সার্বিক সংকট বাড়বে। স্থানীয় লোকজন যেমন ভুক্তভোগী হবে, তেমনি রোহিঙ্গারা নিজেরাও। তাই রাখাইনে স্থিতিশীলতা ফেরাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কাজ করতে হবে।

নিরাপত্তা ও মানবিক সংকট প্রকট হওয়ার কারণেই দ্রুত রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোয় নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। মাদক চোরাচালানের ঘটনা ঘটছে। সার্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে। বর্তমান সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুকে জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই সংকট মোকাবিলায় শুধু বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় করলেই হবে না, আমাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর সঙ্গেও সমন্বয় করতে হবে। কারণ, রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু মানবিক সংকট নয়, এর সঙ্গে নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ মাত্রাও যুক্ত হয়েছে। সে কারণেই এ বিষয়ে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মনোযোগ প্রয়োজন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনে করেন, অনির্দিষ্টকাল চলতে থাকা জরুরি সহায়তার মডেল থেকে বেরিয়ে প্রত্যাবাসন ও প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে যুক্ত একটি রূপান্তর কৌশলের দিকে যেতে হবে। তাঁর মতে, বাস্তুচ্যুতির সময় যত দীর্ঘ হবে, নিরাপত্তাঝুঁকিও তত বাড়বে। তবে মানবিক সহায়তাকে অবশ্যই সমাধানের পথে একটি সেতু হিসেবে থাকতে হবে, সমাধানের বিকল্প হিসেবে নয়।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের দায়িত্ব হলো অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততাকে একত্র করা।বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, প্রকৃত প্রত্যাবাসনের দিকে এগোতে আমরা যাচাইপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। যাচাইপ্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে না। বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার ভিত্তিতে যাচাইপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে শিবিরে জন্ম নেওয়া এবং ২০১৭ সালের পর রাখাইন থেকে আসা ব্যক্তিদের বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি না হওয়া বিগত সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা দায়ী বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। কয়েক দশক আগে প্রতিষ্ঠিত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের দপ্তর এখনো স্পষ্ট নীতিনির্দেশনা ছাড়া কাজ করছে, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি।শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, সরকারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের রোহিঙ্গা শিবিরের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে সাড়া দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।রোহিঙ্গা শিবির পরিচালনায় কর্তৃপক্ষকে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে উল্লেখ করে মিজানুর রহমান বলেন, সরকারের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাবই এখন সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি।গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের চেয়ারম্যান ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) সাবেক প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় তিনটি বিষয় প্রণোদনা, পরিণতি ও প্রেরণা নিয়ে এগোতে হবে। তিনি বলেন, মিয়ানমারকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে বাংলাদেশের কৌশলগত ধৈর্যেরও সীমা রয়েছে, যা ফুরিয়ে আসছে। রোহিঙ্গাদের অল্প অল্প করে বাংলাদেশে পাঠানো অব্যাহত রাখলে এর পরিণতি মিয়ানমারের জন্য আরও গুরুতর হতে পারে।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা একশনএইডের এ দেশীয় পরিচালক ফারাহ কবির বলেন, আমাদের মূল উদ্বেগ হলো আমরা এখনো রোহিঙ্গা সংকটকে মূলত একটি মানবিক সংকট হিসেবে দেখছি। অথচ এটিকে দেখতে হবে ভূরাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও দুর্যোগঝুঁকির সংকট হিসেবে। এ সংকটের পরিণতির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে বাংলাদেশ। বিষয়টি আমাদের পরিষ্কারভাবে সামনে আনতে হবে।নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাজনীতিবিজ্ঞান ও সমাজবিদ্যার অধ্যাপক বুলবুল সিদ্দিকীর সঞ্চালনায় আলোচনায় আরও অংশ নেন বিসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) এ দেশীয় প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন, লিবিয়ায় বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) শহীদুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নীলয় রঞ্জন বিশ্বাস ও সাজ্জাদ সিদ্দিকী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নুরুল হুদা সাকিব, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কাজী মাহমুদুর রহমান, ইউল্যাবের সহকারী অধ্যাপক অবন্তী রহমান এবং আইজিসিএফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আদনান রহমান।