ইরান ও ওমানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনায় দীর্ঘদিনের জটিলতা পেরিয়ে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। শীর্ষপর্যায়ের এক কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, দু’দেশের বৈঠকে এখন মাত্র ‘এক বা দুটি বিষয়’ অমীমাংসিত রয়েছে।
সূত্রটি নিশ্চিত করেছে, বর্তমানে যেসব বিষয় আটকে আছে, সেগুলোকে ‘খুব একটা জটিল বা কঠিন’ বলে মনে হচ্ছে না। পরিস্থিতি বর্ণনা করে জ্যেষ্ঠ ওই কূটনীতিক জানান, ‘যদি অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের ক্ষতিকর বা বৈরী হস্তক্ষেপ না থাকে, তবে দু’ একদিনের মধ্যে মধ্যেই উভয় দেশ একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে।’ কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পানিপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ সচল রাখা নিয়ে গুঞ্জন উঠলেও বিষয়টি পরিষ্কার করেছে সূত্রটি। জানানো হয়েছে, ইরান ও ওমানের মধ্যকার অমতের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা হয়নি। বরং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই তেল পরিবহন পথটি বন্ধ বা পুনরায় উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি স্থাপন ও কৌশলগত নৌরুটগুলোতে স্থায়িত্ব ফেরাতে ইরান-ওমান এই বৈঠককে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। সূত্রের খবর অনুযায়ী, নতুন প্রস্তাবিত চুক্তিতে প্রণালী দিয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায় তেহরান। পাশাপাশি ওমান উপসাগর থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজের বিষয়ে আগাম তথ্য দেওয়া ও প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করার অধিকার দাবি করছে তারা। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত কমাতে এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করতে কাতার, ওমান ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি খসড়া চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানান, উভয় পক্ষকে একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছাতে মধ্যস্থতাকারীরা নিরলস কাজ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-ও আলোচনায় অগ্রগতির কথা নিশ্চিত করেছেন।
দুবাইয়ে ২০ মিনিটে সাত বিস্ফোরণ, ভয়াবহ আগুন : সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে মাত্র ২০ মিনিটের ব্যবধানে অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের ঘটনায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল ভোরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেবেল আলি বন্দর ও শিল্পাঞ্চলে একের পর এক বিস্ফোরণের পর আকাশজুড়ে ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে দ্রুত দমকল, পুলিশ ও জরুরি সেবা সংস্থার সদস্যরা পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। তবে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি আমিরাত কর্তৃপক্ষ। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহর নিউজ দাবি করেছে, আমিরাতের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে তারা জানতে পেরেছে যে মাত্র ২০ মিনিটে অন্তত সাতটি বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের পর জেবেল আলি শিল্পাঞ্চলের একটি অংশে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বন্দর এলাকার ওপর ঘন কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী দেখা গেছে। কয়েকটি আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, ইয়েমেন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার কারণে এ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তবে এসব দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন আন্তর্জাতিক সূত্র কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরকার নিশ্চিত তথ্য দেয়নি। মূলধারার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও বলছে, হামলার দাবি এখনো যাচাই হয়নি এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। জেবেল আলি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে এ ধরনের বিস্ফোরণ শুধু আমিরাতের নিরাপত্তাই নয়, পুরো অঞ্চলের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যুদ্ধবিরতিতেও সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে তেহরান : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ এক মুহূর্তের জন্যও থামায়নি ইরান। দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা বলেছেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হলে তারা আবারও সংঘাতে জড়ানোর জন্য প্রস্তুত। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সমঝোতার সম্ভাবনার কথা জানিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, যুদ্ধবিরতির প্রতিটি মুহূর্তকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানো হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, বিদ্যমান সামরিক সরঞ্জাম আরও কার্যকরভাবে বাহিনীতে যুক্ত করা, ক্ষতিগ্রস্ত অস্ত্রব্যবস্থা মেরামত, নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজ সমান্তরালভাবে চলেছে। তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক সংঘাতে নতুন প্রজন্মের ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। এসব ড্রোনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বৈশিষ্ট্য পরে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
সউদীর ৮ জাহাজে হামলা হুথিদের : মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে লোহিত সাগরের উত্তরাঞ্চলে একটি সউদী তেলবাহী ট্যাংকারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। হামলার শিকার ট্যাংকারটির নাম ‘ওয়াফা’ বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। ইয়েমেনের ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবিতে লোহিত সাগর ও আরব সাগরে সউদী আরবের বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ জোরদার করেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আনসার আল্লাহ (হুথি)। গত ২২ জুলাই হুথিদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবরোধের ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৮টি জাহাজে আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। হুথি গোষ্ঠীর প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, তাদের সামরিক পদক্ষেপের কারণে লোহিত সাগর ও আরব সাগর থেকে অন্তত ২৯টি সউদী জাহাজ গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র এহিয়া সারি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ইয়েমেনের ওপর সউদী আরবের আরোপিত অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত সউদী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা ও নৌ অবরোধ আরও তীব্র করা হবে।
.বিশ্ববাজারে ফের বাড়লো তেলের দাম : লোহিত সাগরে সউদী তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম একলাফে অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্র্যান্ড ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্য ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলার অতিক্রম করেছে। বাজারের তথ্যমতে, ব্র্যান্ড ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেল প্রতি ১.৫১ ডলার বা ১.৯ শতাংশ বেড়ে ৮০.৮৭ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড ফিউচারসের দাম ৯০ সেন্ট বা ১.১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি ৭৬.৬৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
লোহিত সাগরে হামলায় ভারতীয় জাহাজডুবি : ইয়েমেন উপকূলের লোহিত সাগরে হামলার পর ভারতীয় পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ এমএসভি ফাইজে নুরি ওলিয়ে ডুবে গেছে। তবে জাহাজে থাকা ১৪ জন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার ইয়েমেনের হোদেইদা বন্দরের কাছে এ ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, হুথি বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত হোদেইদা বন্দর থেকে প্রায় ১৩ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থানকালে জাহাজটি হামলার মুখে পড়ে। হামলার পর জাহাজটি ভারসাম্য হারিয়ে উল্টে যায় এবং পরে সাগরে তলিয়ে যায়। উদ্ধার হওয়া নাবিকদের মধ্যে ১৩ জন ভারতীয় এবং একজন ইয়েমেনের নাগরিক। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্স জানিয়েছে, তাদের কোস্টগার্ডের নৌ ইউনিট যৌথ উদ্ধার অভিযান চালিয়ে সবাইকে নিরাপদে উদ্ধার করেছে। ঘটনার পর ভারত সরকার কোনো উসকানি ছাড়াই একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তবে হামলার জন্য সরাসরি কোনো পক্ষকে দায়ী করেনি নয়াদিল্লি। সূত্র : আল-জাজিরা, গালফ নিউজ,সিএনএন, এনডিটিভি।