ইন্দোনেশিয়ায় ফুটবল মাঠে দু’পক্ষের সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৭৪ফ্লোরিডায় ঘূর্ণিঝড় ইয়ানের আঘাতে ৬৬ জনের মৃত্যুবিশ্ব পথশিশু দিবস আজসাংবাদিক তোয়াব খান আর নেইঘূর্ণিঝড় ইয়ানে ফ্লোরিডায় নিহত ৪৫
No icon

ইভ্যালির বড় অনিয়ম লেনদেনের হিসাব না রাখা

গ্রাহকদের টাকা নিয়ে প্রতারণার উদ্দেশ্যেই জন্ম হয়েছিল ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির। প্রতিষ্ঠানটির লেনদেনের কোনো হিসাবই ছিল না। দৈনিক কোটি কোটি টাকা লেনদেন হলেও এ সংক্রান্ত কোনো নথিপত্র পাওয়া যায়নি। ফলে ইভ্যালির হাজার হাজার কোটি টাকা কোথায় কীভাবে খরচ হয়েছে মেলেনি তার তথ্য। এসব টাকার হিসাব না রাখাই ছিল প্রতিষ্ঠানটির বড় অনিয়ম। হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত সাবেক বিচারপতি এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের নেতৃত্বাধীন ইভ্যালির পরিচালনা বোর্ডের প্রতিবেদনে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। এর আগে অডিট ফার্ম ‘হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি’ ১৮ সেপ্টেম্বর তিন হাজার পৃষ্ঠার অডিট রিপোর্ট বোর্ডের কাছে দেয়।


এ রিপোর্ট পর্যালোচনা করে ১১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রস্তুত করে বোর্ড, যা বুধবার (২১ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্টে দাখিল করা হয়। এছাড়া বোর্ডের পাঁচ সদস্যের পদত্যাগপত্রও দেওয়া হয়েছে জমা। বোর্ডের পক্ষে ব্যারিস্টার মোর্শেদ আহমেদ খান প্রতিবেদন ও পদত্যাগপত্র দাখিল করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইভ্যালির বিশাল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কোনো স্তরেই জবাবদিহিতা বা স্বচ্ছতা ছিল না। যেটা একটা সফল ম্যানেজমেন্টের মূল স্তম্ভ। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থান চিহ্নিতের মতো কোনো তথ্যই পাওয়া যায়নি বা ইভ্যালির সাবেক ম্যানেজমেন্ট তা মেইন্টেন করেনি।


ইভ্যালির ব্যবসা পুনরায় চালু করা যাবে কি না তা নিয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি প্রতিবেদনে। তবে ব্যবসা চালু করতে চাইলে নতুন করে বিনিয়োগ করতে হবে।  সেক্ষেত্রে কম লোকবল দিয়ে সর্বোচ্চ কাজ করিয়ে নিতে হবে। হিসাব রাখতে হবে প্রতিটি খরচের। অন্যথায় ইভ্যালি থেকে পাওয়ানাদারদের টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারী না পেলে ইভ্যালি সচল থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রাহকদের টাকা নিয়ে প্রতারণার উদ্দেশ্য নিয়ে জন্ম হয়েছিল ইভ্যালির। নিজেদের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ না থাকলেও ইভ্যালির সিইও রাসেল ও তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন গ্রাহকের টাকায় বিলাসী জীবনযাপন করেছেন। ব্যবসা পরিচালনায় সঠিক জ্ঞান না থাকলেও তারা গ্রাহকের সরল বিশ্বাস পুঁজি করে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়েছেন হাতিয়ে। প্রচুর নগদ অর্থ লেনদেন হলেও তার সঠিক গতিপথ খুঁজে পাওয়া যায়নি। এসব অর্থপাচার হয়েছে কি না সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তা ক্ষতিয়ে দেখতে পারে।

অডিট রিপোর্টে ইভ্যালিকে একটি ব্যক্তিসর্বস্ব কোম্পানি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাসেল একাই কোম্পানির সর্বস্ব। তিনি যেমন ইভ্যালির সিইও ও এমডি ছিলেন, আবার তিনিই ছিলেন সিএফও। এ কোম্পানিতে কোনো অ্যাকাউন্টস অফিসার ছিল না। কোম্পানির কার্যক্রম ছিল সম্পূর্ণ এলোমেলো। ইভ্যালির অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নীতি, মানবসম্পদ বিভাগ নীতি, উদ্ভাবনী ব্যবস্থাপনা নীতি, উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয়মূল্য নির্ধারণে কোনো নীতি খুঁজে পায়নি অডিটকারী দল। এছাড়া ইভ্যালির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং বাস্তবায়ন নীতি, ক্রয়-বিক্রয় নীতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা নীতি, প্রকৃত মূলধন নীতি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, মাত্র এক কোটি টাকা মূলধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করা ইভ্যালির দৈনিক লেনদেন ছিল কোটি কোটি টাকা। তবে এসব লেনদেন সংক্রান্ত কোনো নথিপত্র পাওয়া যায়নি। নগদ লেনদেনের অনেক ভাউচার পাওয়া গেলেও ওইসব ভাউচারের টাকা গ্রহীতার হদিস পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাতটি ব্যাংক হিসাবে ৪ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকার বেশি জমা হলেও তা কোথায় কীভাবে সরানো বা ব্যয় হয়েছে তার তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া ব্যাংক থেকে ৭৯ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা নগদ উত্তোলন করা হলেও তা কোন খাতে ব্যয় হয়েছে তার হিসাব মেলেনি। ইভ্যালি সঠিকভাবে শুল্ক ও কর পরিশোধ করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।


প্রতিবেদনে বলা হয়, ইভ্যালি কোম্পানি আইন বা অন্য কোনো বিধিবিধান মেনে চলেনি। এই প্রতিষ্ঠানে যাদের চাকরি দেওয়া হতো তারা সবাই রাসেল বা শামীমার আত্মীয়। তাদের বেতন দেখানো হতো অনেক বেশি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বেতন ছিল তার কম। যেমন- চারজনের বেতন দেখানো হয়েছে এক লাখ টাকা করে। প্রকৃতপক্ষে তাদের বেতন ছিল ৬০ হাজার করে।

অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইভ্যালির সম্পদের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় করেছেন কোম্পানির সিইও রাসেল ও চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন। অথচ তাদের ব্যবসা সংক্রান্ত কোনো জ্ঞান ছিল না। হিসাব-নিকাশের বিষয়ে তাদের ছিল না অভিজ্ঞতা। এ কারণে ইভ্যালির যেসব হিসাব পাওয়া গেছে তার অধিকাংশই ভুয়া বা মিথ্যা।

হাইকোর্টে দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রাহকের সরল বিশ্বাস পুঁজি করে রাসেল-শামীমা দম্পতি প্রতারণামূলক ব্যবসা পরিচালনা করেছেন, যা সম্পূর্ণভাবে অবৈধ ও বেআইনি। অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে যে কোম্পানি কাজ করে, সে কোম্পানি টিকে থাকতে পারে না। হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন করলেও ইভ্যালির স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা ছিল না। অথচ এ লেনদেনের ওপর ভিত্তি করেই রাসেল ও শামীমা নাসরিনসহ ইভ্যালির পদস্থ কর্মকর্তারা বিলাসবহুল জীবনযাপন করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, খরচের হিসাবসংক্রান্ত যেসব নথিপত্র ইভ্যালিতে পাওয়া গেছে তার কোনোটাই গ্রহণযোগ্য নয়। এত টাকা লেনদেনের সঠিক কোনো হিসাব না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই ধারণা জন্মে, এই টাকা পাচার হয়েছে।

ইভ্যালি পরিচালনার জন্য ২০২১ সালের ১৮ অক্টোবর আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের বোর্ড গঠন করেন হাইকোর্ট।

মানিক ছাড়াও বোর্ডের অন্য সদস্যরা ছিলেন স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন বিভাগের সাবেক সচিব মোহাম্মদ রেজাউল আহসান, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফখরুদ্দিন আহম্মেদ এবং কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ। সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবীর মিলনকে ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন হাইকোর্ট।

এরপর ইভ্যালির সাবেক চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন এবং তার মা ও বোনজামাই মামুনুর রশীদকে নতুন পরিচালনা বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে ২৪ আগস্ট নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এছাড়া এই বোর্ডে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব ড. কাজী কামরুন নাহার ও ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইক্যাব) সহ-সভাপতি মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এর আগে গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের মামলায় রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেফতার হন মো. রাসেল ও তার স্ত্রী শামীমা নাসরিন।

এরপর চেক প্রতারণার ৯ মামলায় গত ২১ এপ্রিল রাসেলকে জামিন দেন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। তবে তার বিরুদ্ধে আরও মামলা থাকায় কারামুক্ত হতে পারেননি তিনি। তবে গত ৬ এপ্রিল জামিনে বের হন শামীমা নাসরিন। তিনি বের হয়ে তার শেয়ারের একটা অংশ মা ও ভগ্নিপতিকে দেন।

পদত্যাগের বিষয়ে পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান এএইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, আমাদের ওপর দায়িত্ব ছিল ইভ্যালি অডিট করা। আর এটি সচল করা যাবে কি না, এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়া। আমরা আমাদের কাজ শেষ করেছি। তাই আমরা পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।