নানা নাটকীয়তা শেষে জনপ্রশাসনে ১১৮ কর্মকর্তার পদোন্নতি হলো। গতকাল রাতে যুগ্ম সচিব থেকে তাদের অতিরিক্ত সচিব হওয়ার প্রজ্ঞাপন জারি করল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এই পদোন্নতিতে একীভূত ইকোনমিক ক্যাডারসহ বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২০তম ব্যাচ, অন্যান্য ক্যাডার এবং লেফট আউট কর্মকর্তাদের বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে ১৩০ জনকে পদোন্নতির কথা থাকলেও শেষ পর্যায়ে ১২ জনের নাম বাদ পড়েছে। এ ছাড়া যোগ্য এবং দলবাজি করেননি এমন কিছু কর্মকর্তাও বঞ্চিত হয়েছেন। এ কারণে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।এই পদোন্নতির ক্ষেত্রে বাদ দেওয়া হয়েছে নৈশ ভোটের জেলা প্রশাসক (ডিসি), ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীদের পিএস, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর সহযোগী পিএস, এপিএস এবং তার অন্ধ অনুসারী এবং দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে এমন কর্মকর্তাদের। আর পদোন্নতির বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে স্বৈরাচারী আমলে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হওয়া এবং পেশাদারত্বের সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শতাধিক অনুবিভাগ ও প্রেষণ পদে যেখানে অতিরিক্ত সচিবের অভাবে পদায়ন করা যাচ্ছে না, সেসব স্থানে এই পদোন্নতি অনেক সময়োপযোগী। এতে স্থবিরতা কাটিয়ে প্রশাসনে প্রত্যাশিত গতিশীলতা ফিরে আসবে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।নির্বাচনের আগে প্রশাসনে পদোন্নতির চাপ ছিল। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা ২০ ব্যাচের যুগ্ম সচিবদের অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছিল না। একই কারণে প্রশাসনের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে ভাটা পড়ে। তা ছাড়া সরকারের বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থায় প্রধানের দায়িত্ব চলছে ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে। অতিরিক্ত সচিবের অভাবে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয় বলে দাবি করা হচ্ছে।জানা গেছে, কোনো কোনো দপ্তরপ্রধানের পদ আট মাস, কোথাও পাঁচ মাস, কোথাও তিন মাস ধরে খালি। সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও অধিদপ্তর বা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও শীর্ষপদে কাউকে দেওয়া হচ্ছে না। চেয়ারম্যান ও মহাপরিচালক পদে কাউকে রুটিন দায়িত্ব বা ভারপ্রাপ্ত দিয়ে এসব সংস্থা চালানো হচ্ছে। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। খালি থাকা এসব পদে মূলত নিয়োগ হয় অতিরিক্ত সচিব পদ থেকে। কখনও কখনও গ্রেড-১-কেও দায়িত্ব দেওয়া হয়। বলা হচ্ছে এ ব্যাচে বিগত শেখ হাসিনা সরকারের অনৈতিক সুবিধাভোগী কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি। তাই তাদের পদোন্নতি দেওয়া সমীচীন হবে না।
অন্যদিকে কর্মকর্তারা বলছেন, যারা ফ্যাসিস্ট সরকারের আনুকূল্যে জেলা প্রশাসক হননি, নৈশ ভোটের রিটার্নিং অফিসার ছিলেন না, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের পিএস হননি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক, মহাপরিচালক হিসেবে পদায়িত ছিলেন না অথবা কোনোভাবেই অবৈধ সুবিধার ভাগীদার নন তাদের পদোন্নতি দিতে জটিলতা কোথায়? সব জট পেরিয়ে গতকাল রাতে প্রজ্ঞাপন জারি করল সরকার। তবে এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ নির্বাচিত সরকারের আগে পদোন্নতির বিপক্ষে ছিলেন।সংশ্লিষ্টরা জানান, অতিরিক্ত সচিব না থাকায় ৪০টির মতো প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান, মহাপরিচালক পদে পদায়ন সম্ভব হছিল না। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রায় ৮০টির মতো অনুবিভাগে পদায়ন করা যাচ্ছে না। বর্তমানে এসব দপ্তর, সংস্থা ও মন্ত্রণালয়-বিভাগ চলছে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে।সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের সময় জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কিছু কর্মকর্তা এবং ২০তম ব্যাচের প্রকাশনা অনুভবে বঙ্গবন্ধু বইয়ের ২৫ জন অতি উৎসাহী লেখককে পদোন্নতির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এ ব্যাচের ৪৩ কর্মকর্তা শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিভিন্ন জেলার ডিসি এবং ৪০ কর্মকর্তা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন। তাদের পদোন্নতি বিবেচনা করা হয়নি। অন্যদিকে দপ্তর বা সংস্থায় কাউকে পদায়ন দিতে না পারায় রুটিন কাজ করতে ভারপ্রাপ্ত দেওয়া হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার আর্থিক ক্ষমতা নেই। অনেক কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত হলেও অন্য কর্মকর্তা সমমানের হওয়ায় চেইন অব কমান্ডে সমস্যা হচ্ছে, যার সার্বিক প্রভাব পড়ছে প্রতিষ্ঠানের ওপর।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, যুগ্ম সচিব হিসেবে ২ বছর সন্তোষজনক চাকরির পর যেখানে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতিযোগ্য হয়, সেখানে ৪ বছর পার করেও ২০তম ব্যাচের উপযুক্ত অফিসারদের পদোন্নতি হচ্ছিল না। প্রতিবছর পরবর্তী নিয়মিত ব্যাচ থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। অতিরিক্ত সচিব পদে ২০২২ সালের জুনে কর্মকর্তা ছিলেন ৫৯৮ জন, ২০২৩ সালে ৫৪৭ ও ২০২৪ সালের জুনে তা ৫৪৬ দাঁড়ায়। একই বছর তথা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আরও কমে ৫২৮ জন হয়ে যায়। এরপর ২০২৫ সালের জুনে ৪৪১ জন, ২০২৫ সালের অক্টোবরে ৩৩০, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ২৮৮ ও জুনে দাঁড়াবে ২৬০ জনে। সর্বশেষ গত ১৯ ডিসেম্বর এসএসবির বৈঠক হয়েছিল। ২০ ব্যাচের একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বাদ পড়ায় পদোন্নতির ব্যাপারে আপত্তি ছিল একটি সিন্ডিকেটের। শেষ পর্যন্ত সব বাধা উতরিয়ে গতকাল রাতে প্রজ্ঞাপন জারি করল অন্তর্বর্তী সরকার।