বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। জলপথটিতে চলাচলের চেষ্টাকারী যে কোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করারও হুমকি দিয়েছে বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এ ঘোষণার ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে ধাক্কা লেগেছে। হরমুজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকলে এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। হরমুজ বন্ধ করে আইআরজিসি ঘোষণা করেছে, এক ফোঁটা তেলও বাইরে যাবে না।হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ধমনি হিসেবে মনে করা হয়। জ্বালানি পরামর্শদাতা সংস্থা কেপলারের মতে, ২০২৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ১৩ মিলিয়ন ব্যারেল এই প্রণালির মধ্য দিয়ে আনা-নেওয়া করা হয়, যা সমুদ্রবাহিত সব অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩১ শতাংশ। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রণালি বন্ধ থাকলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। এমনকি তেল প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। বিশ্বব্যাপী বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট সর্বশেষ ২.৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৮০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে যার দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেশি বেড়েছে।
কেপলারের মতে, হরমুজ বন্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা বিশ্বব্যাপী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেল। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারী দেশ কাতার। এই জ্বালানি হরমুজ প্রণালি দিয়ে পাঠানো হয় বিভিন্ন দেশে। সোমবার কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি এবং মেসাইদ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ইরানি ড্রোন হামলার পর তারা উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে।জাপানের বহুজাতিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ও আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান নোমুরি একটি নোটে লিখেছে, এশিয়ায় থাইল্যান্ড, ভারত, কোরিয়া ও ফিলিপাইন উচ্চ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। এ কারণে এই দেশগুলোতে দাম বেশি বাড়ার উচ্চঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে, মালয়েশিয়া কিছুটা সুবিধা পাবে। কারণ, দেশটি জ্বালানি রপ্তানি করে। তীব্র সংকটের মুখে দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষকরা বলেছেন, হরমুজ বন্ধের ফলে দক্ষিণ এশিয়া সবচেয়ে বেশি খারাপ পরিস্থিতির শিকার হবে। বিশেষ করে এলএনজি সরবরাহে ঘাটতি থাকলে এই অঞ্চল খুবই বিপাকে পড়ে যায়। কেপলারের তথ্য অনুসারে, পাকিস্তানের ৯৯ শতাংশই এলএনজি আমদানি করে থাকে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ৭২ শতাংশ, ভারত ৫৩ শতাংশ আমদানি করে থাকে। এগুলো মূলত আসে কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে।
বাংলাদেশে এলএনজির সীমিত মজুত রয়েছে। পাকিস্তানেরও একই দশা। জ্বালানি অর্থনীতি ও আর্থিক বিশ্লেষণ ইনস্টিটিউটের মতে, বাংলাদেশ প্রতিদিন এক হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি ঘাটতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চীন সংকটে পড়লেও সামাল দিতে পারবে হরমুজ বন্ধ হলে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা পরীক্ষার মধ্যে পড়বে। কিন্তু মজুত ও বিকল্প সরবরাহের মধ্যে বিকল্প পথ তাদের থাকবে। কেপলারের মতে, দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক ও ইরানের ৮০ শতাংশের বেশি তেলই চীন কেনে।সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রাইভেট ব্যাংক ইউবিপির মতে, চীনে এলএনজি আমদানির প্রায় ৩০ শতাংশ আসে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এসব জ্বালানির প্রায় ৪০ শতাংশই হরমুজ দিয়ে যায়। কেপলারের মতে, ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত চীনের এলএনজি মজুত ৭.৬ মিলিয়ন টন, যা স্বল্পমেয়াদি প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে। তবে হরমুজে যদি বিভ্রাট অব্যাহত থাকে, তাহলে চীনকে আটলান্টিক কার্গোর জন্য প্রতিযোগিতা করতে হবে, যা পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলবে। এই ক্ষেত্রে এশিয়াজুড়ে দামের প্রতিযোগিতা বেড়ে যেতে পারে।