মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা। ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তায় বিশ্ববাজারে সার ও এর কাঁচামাল সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইতোমধ্যে সারের দাম বাড়তে শুরু করেছে।এ পরিস্থিতিতে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশও নতুন করে উদ্বেগের মুখে পড়েছে। দেশে বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয়। এর বড় অংশ আমদানি করতে হয়। গ্যাস সংকটে দেশের ছয়টি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে পাঁচটি সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। ফলে দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে সংকটের আশঙ্কা নেই। জুনের পর সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে– এমন আশঙ্কায় পাঁচ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে সরকার।
অনিশ্চয়তায় ডিএপি আমদানি দেশে কৃষি উৎপাদন অনেকটা রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুসারে, সারের চাহিদা ৬৮ থেকে ৬৯ লাখ টন। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৬ লাখ টন। এরপর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সার। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে জটিলতায় সৌদি আরব থেকে ডিএপি আমদানি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসে সৌদি আরব থেকে ৪০ হাজার টনের এক লট ডিএপি আমদানির কথা ছিল। সেটি আপাতত না আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।সংস্থাটির দাবি, দেশে পর্যাপ্ত মজুত থাকায় মার্চে নতুন করে ডিএপি আমদানির প্রয়োজন নেই। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প উৎস দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। বিএডিসি মূলত সৌদি আরব, চীন ও মরক্কো থেকে এসব সার আমদানি করে। গত বছর চীন থেকে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিএপি আমদানি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের একটি কোম্পানির সঙ্গে বছরে ছয় লাখ টন ডিএপি আমদানির চুক্তিও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে চীন ও মিসর বাংলাদেশকে ডিএপি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে দুবাই থেকেও ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার সরবরাহের প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এসব প্রস্তাব নিয়ে সরকার আলোচনা করছে।কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন ডিএপি সারের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীন ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড বছরে প্রায় এক লাখ টন সার উৎপাদন করে। বাকিটা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়, এর বেশির ভাগ করে বিএডিসি।চলতি বছর বিএডিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী মোট ২৬ লাখ ৩৫ হাজার টন সার আমদানি করা হবে। এর মধ্যে ডিএপি ১১ লাখ ৭৬ হাজার টন, এমওপি ৮ লাখ ৫৯ হাজার টন এবং টিএসপি সাড়ে ছয় লাখ টন।কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৬ লাখ ৮৪ হাজার টন সার মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৮১ হাজার টন ইউরিয়া, ৩ লাখ ৮৩ হাজার টন টিএসপি, ৪ লাখ ৭১ হাজার টন ডিএপি এবং ৩ লাখ ৪৯ হাজার টন এমওপি মজুত আছে। এই মজুত দিয়ে মে-জুন পর্যন্ত কৃষিকাজ চালানো সম্ভব।কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার যুগ্ম সচিব মো. খোরশেদ আলম বলেন, বর্তমান মজুত দিয়ে অন্তত মে থেকে জুন পর্যন্ত সারের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। চলমান বোরো মৌসুমের জন্য প্রয়োজনীয় সার এরই মধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে এ মৌসুমে বড় কোনো সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই।