বিশ্বজুড়ে জ্বালানির প্রচলিত সরবরাহ ব্যবস্থা চাপের মধ্যে পড়েছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি আমদানি করবে বাংলাদেশ। এলপিজি আমদানি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশনের (ডিএফসি) তহবিল থেকে অর্থায়ন পাওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব ছাড়ার কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি সই হয়। চুক্তির লক্ষ্য দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার মূল্যের এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির শর্ত রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় এবার দীর্ঘমেয়াদে এলপিজি আমদানির সরকারি উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা।
জানা গেছে, গত ২৯ জুন ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ইকোনমিক মিনিস্টার ডা. মো. ফজলে রাব্বী এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সিনিয়র ইকোনমিক অ্যাডভাইজার লরা অ্যান্ডারসনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের ফলাফল ও সুপারিশমালা সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিবের কাছে পাঠানো হয়। বৈঠকে ইকোনমিক মিনিস্টার যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদে এলপিজি আমদানিতে সহযোগিতা এবং ডিএফসি অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশের যোগ্যতা নিশ্চিত করতে মার্কিন সরকারের জোরালো সমর্থন চান। তিনি জানান, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ইতোমধ্যে এলপিজি সরবরাহের জন্য আগ্রহপত্র জমা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক সাড়া দিতে উৎসাহিত করতে মার্কিন সরকারের সহযোগিতাও চাওয়া হয়।
বাংলাদেশের প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে লরা অ্যান্ডারসন জানান, বিষয়টি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, জ্বালানি বিভাগ এবং বাণিজ্য বিভাগ যৌথভাবে কাজ করছে। এলপিজি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে শিগগিরই যোগাযোগ করে তাদের অংশগ্রহণ সহজতর করা হবে। এ জন্য যেসব কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন, তাদের তালিকা দ্রুত পাঠাতে বাংলাদেশ দূতাবাসকে অনুরোধ জানান তিনি।জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রকে বিকল্প ভাবা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান ইরান যুদ্ধ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তার কারণে বিকল্প উৎসের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। ইতেমাধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানিও বেশ বেড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘ সমুদ্রপথে এলপিজি আনতে পরিবহন ব্যয় তুলনামূলক বেশি।
ডিএফসি তহবিল ও শ্রম অধিকার ইস্যু
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও কৌশলগত বিনিয়োগ বাড়াতে ২০১৯ সালে ছয় হাজার কোটি ডলারের মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করে ডিএফসি। অবকাঠামো, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগে ঋণ ও গ্যারান্টি সুবিধা দিয়ে থাকে সংস্থাটি। বাংলাদেশও দীর্ঘদিন ধরে এ তহবিলের সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে শ্রম অধিকার, পরিবেশগত মান, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ এবং সামগ্রিক কর্মপরিবেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশ এখনও ডিএফসি অর্থায়নের যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তবে বৈঠকে লরা অ্যান্ডারসন আশাবাদ ব্যক্ত করেন, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ডিএফসি অর্থায়নের যোগ্য হতে পারে। তিনি পরামর্শ দেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে উত্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি সম্ভাব্য মার্কিন বিনিয়োগকারীদের সামনে উপস্থাপনের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পের একটি তালিকা প্রস্তুত রাখারও পরামর্শ দেন।এ বিষয়ে বিডার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ডিএফসি অর্থায়নের সুযোগ মিললে অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্প উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতা বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে, যার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার যে কোনো সংকটে দেশ চরম নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ে যায়।
বড় জ্বালানি প্রকল্পে মার্কিন আগ্রহ
বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও কার্যকর করতে খাতভিত্তিক ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল বিনিময়ের ওপর জোর দেওয়া হয়। গত মে মাসে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সহায়তায় একটি সফল ব্যবসায়ী সফরের অভিজ্ঞতার আলোকে উভয়পক্ষ একমত হয়, বড় আকারের প্রতিনিধি দলের পরিবর্তে নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক প্রতিনিধি দল পাঠালে বাণিজ্যিক সুফল বেশি পাওয়া যাবে। এ জন্য যৌথভাবে অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের দুটি বড় জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্প ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় শোধনাগার (ইআরএল-২) এর দরপত্রে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ইকোনমিক মিনিস্টার জানিয়েছেন, বিষয়টি দ্রুত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে জানানো হবে।