→ ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩০০ ছুঁইছুঁই→ বিএনপির সংসদীয় দলের সভা ডাকলেন তারেক রহমান→ সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি আহত, পাল্টা গুলিবর্ষণ বিজিবির→ রিয়াদগামী ২ ফ্লাইট স্থগিত করল বিমান→ ভারতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা
No icon

বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস : অঙ্গীকার ও আগামীর প্রত্যাশা

কক্সবাজারের উখিয়ার ১৬ বছর বয়সী তাহমিনার সামনে তখন দশম শ্রেণির পড়াশোনা। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকট ও বাবার অসুস্থতার কারণে হঠাৎ করেই বদলে যেতে বসেছিল তার ভবিষ্যৎ। পড়াশোনার বদলে পরিবার তার বিয়ের কথা ভাবতে শুরু করে।বিয়ের কথা শুনে ভেঙে পড়ে তাহমিনা। নিয়মিত কাঁদতে থাকে সে। তবে বিয়ে মেনে না নিয়ে নিজের কথা জানানোর সিদ্ধান্ত নেয় কিশোরীটি। ২০২৩ সালে ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে এ গল্পটি উঠে আসে। এর দ্বারা উপলব্ধি করা যায়, বাংলাদেশের কন্যাশিশুর অবস্থান, অধিকার ও সমাজব্যবস্থার করুণ বাস্তবতা।একটি দেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে সেই দেশের কন্যাশিশুরা আজ কেমনভাবে বেড়ে উঠছে তার ওপর। যে সমাজ একটি মেয়ের শৈশবকে নিরাপদ রাখে, তার শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে দেখে, তার স্বপ্নকে পরিবারের সামর্থ্যের সঙ্গে মেপে ছোট করে না এবং তাকে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয়, সেই সমাজ শুধু একটি প্রজন্মকে বদলায় না, তার পরবর্তী প্রজন্মের ভিত্তিও শক্তিশালী করে। আর যে সমাজ মেয়ের ভবিষ্যৎকে বাল্যবিবাহ, নিরাপত্তাহীনতা, দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক কুসংস্কারের কাছে সমর্পণ করে, সেখানে উন্নয়নের অনেক অর্জনই শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই কন্যাশিশুর প্রশ্নটি আজ দেশের মানবসম্পদ, অর্থনীতি, সামাজিক ন্যায় এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশ্ন।

১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস । ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য, ;। প্রতিপাদ্যটির তাৎপর্য এখানেই যে, কন্যাশিশুর সুরক্ষাকে শুধু ক্ষতিকর একটি প্রথা বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপত্তা, নেতৃত্ব এবং নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারকে একই আলোচনার অংশ করা হয়েছে। জাতিসংঘ ও ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বিশ্বে প্রতিবছর এক কোটিরও বেশি মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। একই সঙ্গে গত ২৫ বছরে শিক্ষা, আইন সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগের ফলে আনুমানিক ৬ কোটি ৮০ লাখ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। আবার ইউনিসেফের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে এ-ও বলা হয়েছে, গ্রামীণ মেয়েরা শহরের মেয়েদের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। একইভাবে দরিদ্র পরিবার ও কম শিক্ষিত মেয়েদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার অনেক বেশি। অর্থাৎ শুধু স্কুলে ভর্তি করানো যথেষ্ট নয় । মেয়েকে স্কুলে ধরে রাখা, মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করানো এবং তারপর উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পথে নিয়ে যাওয়া, এটাই হওয়া উচিত পরবর্তী লক্ষ্য। ফলে সমস্যাটি বড় হলেও পরিবর্তন অসম্ভব নয়; সঠিক নীতি, ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং সামাজিক পরিবর্তন একসঙ্গে কাজ করলে বাস্তব ফল পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই দ্বৈত বাস্তবতা স্পষ্ট। একদিকে মেয়েদের শিক্ষায় বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, অন্যদিকে বাল্যবিবাহ এখনও সেই অগ্রগতির সামনে বড় বাধা। বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে বা MICS 2025-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে এবং ১৩.৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়সের আগেই। গ্রামীণ ও দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। অর্থাৎ মেয়েদের বিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা যে অগ্রগতি অর্জন করেছি, তাদের শৈশব, কৈশোর ও জীবন সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও বড় একটি পথ বাকি ।এই জায়গাতেই কন্যাশিশুর উন্নয়নকে শুধু অধিকারের দৃষ্টিতে নয়, সক্ষমতার দৃষ্টিতেও বোঝা জরুরি। অমর্ত্য সেনের Capability Approach আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো অধিকার কাগজে থাকা এবং সেই অধিকার বাস্তবে ব্যবহার করার ক্ষমতা থাকা এক বিষয় নয়। একটি মেয়ের স্কুলে যাওয়ার অধিকার থাকতে পারে, কিন্তু যদি দারিদ্র্যের কারণে তাকে স্কুল ছাড়তে হয়, নিরাপত্তাহীনতার কারণে তার চলাচল সীমিত হয়, পরিবারের সিদ্ধান্তে তার মতামতের মূল্য না থাকে কিংবা অল্প বয়সে তার বিয়ে হয়ে যায়, তাহলে তার আনুষ্ঠানিক অধিকার বাস্তব স্বাধীনতায় রূপ নেয় না। উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন একটি মেয়ে শুধু সুযোগ পায় না, সেই সুযোগ ব্যবহার করার সক্ষমতাও অর্জন করে।

বাংলাদেশের মেয়েদের শিক্ষায় অগ্রগতির ইতিহাস তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নব্বইয়ের দশকে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় উপবৃত্তি ও অন্যান্য প্রণোদনা চালু করার ফলে বিদ্যালয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ে। পরে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সময় মেয়েদের শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের এই দর্শন আরও দৃশ্যমান রূপ পায়। মেয়েদের জন্য সর্বজনীন উপবৃত্তির যে নীতি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে, তার মূল দর্শন ছিল পরিষ্কার : একটি মেয়ের শিক্ষা তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করবে না; রাষ্ট্রও তার ভবিষ্যতের অংশীদার হবে। এই কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বাংলাদেশের মেয়েদের শিক্ষায় লিঙ্গসমতা অর্জনের পথকে উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত করেছে। এমনকি ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের সভায় বেগম খালেদা জিয়ার সময়কার universal girls stipend এর অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য তা পুনঃপ্রবর্তনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সভায় dropout কমানো এবং স্কুল পর্যায়ে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় ।