দেশের ৮টি বিভাগে বৃষ্টির আভাসডেঙ্গু প্রতিরোধে যুবদলের ৭ দিনব্যাপী কর্মসূচিঢাকায় মেঘলা আকাশ, কী বলছে আবহাওয়া অফিসআল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ৪ স্বতন্ত্র পরিচালকের পদত্যাগডিজিটাল নিরাপত্তার মতোই হচ্ছে সাইবার সুরক্ষা আইন
No icon

ডিজিটাল নিরাপত্তার মতোই হচ্ছে সাইবার সুরক্ষা আইন

সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের জন্য খসড়া প্রস্তুত করেছে সরকার। এতে মানহানির অপরাধে সাজা যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা, গুজব-অপতথ্য ছড়ালে ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে খসড়ায়। এ রকম কিছু ধারা আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিরোধী দল ও নাগরিক সংগঠনগুলোও বলছে, খসড়ায় মানহানি, গুজব-অপতথ্যের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে; এগুলোর অপব্যবহার হতে পারে।আওয়ামী লীগ আমলের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মানহানির জন্য ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান ছিল। সমালোচনার মুখে সেই আইন বিলোপ করে সাইবার নিরাপত্তা আইন করা হয়। এতে জরিমানার বিধান থাকলেও কারাদণ্ড ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মানহানির অংশ বাদ দিয়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ করা হয়। বিএনপি সরকার সেই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করলেও ছয় মাসের মাথায় এসে তা সংশোধন করে পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান করতে চাইছে। এ ছাড়া গুজব, অপতথ্য প্রচার করলে ১০ বছর কারাদণ্ডের প্রস্তাব রয়েছে সংশোধনীর খসড়ায়।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ইতোমধ্যে আইন সংশোধনের খসড়া প্রকাশে করেছে। এতে উদ্বেগ জানিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, খসড়াটি পাস হলে সাইবার জগৎ নিপীড়নের ভুবনে পরিণত হবে।সাইবার সুরক্ষা আইনের এ সংশোধনী হলে তাতে মতপ্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছে গবেষণা সংস্থা টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট। সংস্থাটির মতে, সংশোধনীতে মানহানির সংজ্ঞা আগের চেয়ে আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। পাশাপাশি ২৫ ও ২৬ ধারায় অবমাননা গুজব ও অপতথ্য -সংক্রান্ত নতুন অপরাধ যুক্ত করা হয়েছে। এসব শব্দের সংজ্ঞা যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। ফলে কোনো বক্তব্য মানহানিকর, মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা গুজব কিনা, তা নির্ধারণে ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

খসড়ার বিষয়ে জানতে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে  । ফোনকল এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও তারা সাড়া দেননি। তথ্যপ্রযুক্তি সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞার বক্তব্যও পায়নি  ।জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, আইনের সংশোধনীর খসড়ার কথা বলা হচ্ছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও প্রকাশ হয়নি। প্রকাশের পর এ বিষয়ে সরকার বক্তব্য জানাবে।তবে সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন করে আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো মানহানিকর বক্তব্যের কারণে কারাদণ্ডের বিধান রাখার প্রশ্নে সরকারের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী এ বিধানের পক্ষে। কিন্তু বিএনপির ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং দলের আগের অবস্থান বিপরীত হওয়ায় সরকারের অনেকে এমন সংশোধনীর বিপক্ষে। তাদের আশঙ্কা মানহানি, হেয় প্রতিপন্ন, বুলিংয়ের মতো বিধান যুক্ত করলে এর অপব্যবহার হবে, যা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে। প্রমাণিত গুজব, অপতথ্য প্রচারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। তবে এ জন্য গুজব, অপতথ্য চিহ্নিত করার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি থাকতে হবে। শেখ হাসিনার শাসনামলে কঠোর আইন

২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন করা হয়। ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করে কঠোর করে আওয়ামী লীগ। মানহানি, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়, এমন কিছু অনলাইনে লেখা, বলাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় ৫৭ ধারায়। সরকারের সমালোচকদের মামলা ও কারাগারে পাঠানোর কারণে ধারাটি কুখ্যাত হয়ে ওঠে।দেশ-বিদেশে সমালোচনার মুখে আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ২১ ধরায় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা বা প্রচারণা চালালে ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান ছিল। ২০১৯ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকীতে বরিশালের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম শ্রদ্ধা জানানোর সময় বাম হাত দিয়ে ফুল ধরে ছবি তোলায় এক বছর কারাদণ্ড হয়।

মানহানির আসামি হয়েছিলেন তারেক রহমানও

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ এবং ২৯ ধারায় অনলাইনে যে কোনো বক্তব্য, সংবাদ, লেখাকে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা, মানহানিকর আখ্যা দিয়ে মামলার সুযোগ ছিল। মানহানিকর বক্তব্য দিয়েছেন এ অভিযোগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মামলা করেছিলেন ছাত্রলীগ নেতারা। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এই মামলায় অভিযোগপত্রও গৃহীত হয়েছিল। তারেক রহমান অনলাইনে বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানের অবমাননা এবং মানহানি করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়। দেশে-বিদেশে সমালোচনার মুখে ২০২৩ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিলুপ্ত করে সাইবার নিরাপত্তা আইন করে আওয়ামী লীগ সরকার। এই আইনেও জাতির পিতাকে অবমাননা, কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে মানহানিকর বক্তব্য, আক্রমণাত্মক বক্তব্যকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে ওই আইনে মানহানির জন্য ১০ বছর কারাদণ্ডের বদলে ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান করা হয়।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৪৩৬টি মামলায় ৪ হাজার ৫২০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এসব মামলার ৬০ শতাংশের বাদী ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।সিজিএস ৮৫৯টি মামলার বাদীর পরিচয় শনাক্ত করেছিল। ২৬৩টি মামলাই করেছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা। শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি, নেতাদের নিয়ে কটূক্তির মাধ্যমে মানহানি করার অভিযোগে এসব মামলায় ৮৮৭ জনকে আসামি করা হয়েছিল। অধিকাংশ আসামি ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এর পরেই ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী এবং ফেসবুকের সাধারণ ব্যবহারকারীরা। শেখ হাসিনার বিধবা ভাতা পাওয়া উচিত ফেসবুকে এমন মন্তব্যের কারণে ২০২০ সালের জুনে ১৫ বছর বয়সী স্কুল শিক্ষার্থী মো. ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের দায়ের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায়। শেখ হাসিনা ও ব্যবসায়ী নাফিজ শারাফাতকে বিদ্রুপ করে আঁকা কার্টুন ফেসবুকে পোস্ট করায় ২০২০ সালের মে মাসে লেখক মুশতাক আহমেদকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করেছিল র‍্যাব। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কথাবার্তা ও গুজব ছড়ানোর মামলায় তাঁর জামিন আবেদন ছয়বার নাকচ হয়। ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়।