→ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় আসছে বড় পরিবর্তন→ জানা গেল রোজা শুরুর সম্ভাব্য তারিখ→ ঢাকায় ২৪ ঘণ্টার অভিযানে গ্রেফতার ৫৪৪→ ৭ নভেম্বর পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা→ নতুন ৩টি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের
No icon

চিকিৎসা খাতে বড় বাধা খরচ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাও দুর্বল

ঢাকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি। সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্যও অনেককে বড় হাসপাতাল ও বিশেষায়িত কেন্দ্রে যেতে হয়। এতে এসব প্রতিষ্ঠানে রোগীর চাপ বাড়ছে। পাশাপাশি সময় ও চিকিৎসার ব্যয় বাড়ছে।স্বাস্থ্যব্যবস্থার ক্ষেত্রে রাজধানী ঢাকার দুর্বলতার বিষয়টি বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকার দিকে তাকালেও আঁচ করা যায়। সবচেয়ে খারাপের দিক দিয়ে তালিকায় ঢাকার অবস্থান তৃতীয়। বাসযোগ্যতার পাঁচ সূচকের অন্যতম স্বাস্থ্যসেবায় ঢাকার স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৪২।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার ওয়ার্ড ও মহল্লাভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা জরুরি; দরকার কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থাও। একই সঙ্গে চিকিৎসার ব্যয় কমাতে সরকারি অর্থায়ন বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্যবীমার আওতাও বাড়ানো প্রয়োজন।ব্রিটিশ সাময়িকী দি ইকোনমিস্টের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঢাকার স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২২ বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন শহরের বাসযোগ্যতার মান প্রকাশ করে আসছে।

ইআইইউর ২০২৬ সালের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স অনুযায়ী, বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে সামগ্রিক বাসযোগ্যতায় ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। অর্থাৎ খারাপের দিক থেকে তৃতীয়। বাসযোগ্যতার পাঁচটি প্রধান সূচকের একটি স্বাস্থ্যসেবা। এ খাতে ঢাকার স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৪২। অথচ বিশ্বের গড় ৭৮। এশিয়ার গড় ৭৬।বাসযোগ্যতা সূচকের মোট নম্বরের ২০ শতাংশই স্বাস্থ্যসেবা খাতে। সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা ও মান, ওটিসি ওষুধের প্রাপ্যতা এবং সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন সূচক বিবেচনায় নিয়ে এ স্কোর নির্ধারণ করা হয়েছে।, গত বছরের তুলনায় বিশ্বে স্বাস্থ্যসেবার গড় স্কোর শূন্য দশমিক ৭ পয়েন্ট বেড়েছে। এশিয়ার কয়েকটি শহরেও সরকারি বিনিয়োগের কারণে স্বাস্থ্যসেবায় উন্নতি হয়েছে। চীনের পাঁচটি শহরের স্বাস্থ্যসেবা স্কোর ৮০-এর ওপরে। পর্তুগালের লিসবনেও এ খাতে অগ্রগতি হয়েছে।বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরগুলো স্বাস্থ্যসেবায়ও এগিয়ে। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, সিডনি, অ্যাডিলেড, সুইজারল্যান্ডের জুরিখ, জেনেভা এবং জাপানের ওসাকা, টোকিওর স্বাস্থ্যসেবা স্কোর ১০০। ডেনমার্কের কোপেনহেগেন ও কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের স্কোর ৯৬।

স্বাস্থ্যসেবার মানে অঞ্চলভেদে বড় পার্থক্য রয়েছে। ইআইইউর সূচকে পশ্চিম ইউরোপের শহরগুলোর গড় স্বাস্থ্যসেবা স্কোর ৯৫, উত্তর আমেরিকার ৯২, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ৬৮ এবং সাব-সাহারান আফ্রিকার ৪৭। এশিয়ার গড় ৭৬ আর বিশ্ব গড় ৭৮। সেখানে ঢাকার স্কোর মাত্র ৪২, অর্থাৎ স্বাস্থ্যসেবার স্কোরে বিশ্ব গড়ের চেয়ে ৩৬ এবং এশিয়ার গড়ের চেয়ে ৩৪ পয়েন্ট পিছিয়ে ঢাকা।স্বাস্থ্যসেবা খাতের সংস্কার ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের বড় হাসপাতাল ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই রাজধানীতে। কিন্তু রোগীর চাপ, জনবল সংকট, অব্যবস্থাপনা ও সেবার অসম বণ্টন দীর্ঘদিনের সমস্যা।জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মোশতাক হোসেন বলেন, ঢাকায় সরকারি পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। সামান্য অসুস্থতার জন্যও মানুষকে মেডিকেল কলেজ বা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। এতে বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ে; ব্যাহত হয় জরুরি চিকিৎসাসেবাও। তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার শক্ত ভিত্তি ছাড়া কোনো শহরের স্বাস্থ্য সূচকের উন্নতি সম্ভব নয়।

চিকিৎসার ব্যয়কেও বড় সমস্যা বলে মনে করেন মোশতাক হোসেন। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ রোগীকেই বহন করতে হয়। বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেবার ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।জনস্বাস্থ্যবিদ ড. আবদুস সবুর বলেন, ঢাকায় বিশ্বমানের কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সেবা সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। তাঁর মতে, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তা না হলে নগরবাসীর জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদনহীন ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসি পরিচালনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে তদারকি বাড়াতে হবে। সাবেক ডিজিএইচএস পরামর্শক ডা. আইনুর নিশাদ রাজীব বলেন, হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ালেই স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ে না। রোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসার মান নিশ্চিত করতে হবে। ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের গুণগত মানও নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য কার্যকর নজরদারি দরকার।

আইনুর নিশাদ বলেন, ঢাকার স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ বা শয্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়; নগরবাসীর জন্য শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি সেবার মান ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢাকার বাসযোগ্যতা উন্নয়নে পরিবহন, আবাসন ও পরিবেশের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নও জরুরি। ইআইইউর সূচকে স্বাস্থ্যসেবায় মাত্র ৪২ স্কোর সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। নগরবাসীর জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা না গেলে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে ঢাকার বাসযোগ্যতার বড় ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো শাখার পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন করা হচ্ছে। গত ছয় মাসে পাঁচ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়েছে। এর মধ্যে অনিয়মের কারণে প্রায় ২৫০টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে অথবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এ ধরনের তদারকি ও ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলমান।রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক মান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নগরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেনারেল প্র্যাকটিসিং (জিপি) ক্লিনিক ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। জেলা পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের কাজ চলছে। তিনি বলেন, চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি ও সেবার মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা উন্নত করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।