হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা, সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোয় হামলা এবং রিয়াদের সঙ্গে তেহরানের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে বৈঠকটি স্থগিত হয়েছে। সৌদি আরবই বৈঠকটি পেছানোর অনুরোধ জানিয়েছে বলে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।ওমানের সালালাহে সোমবার বৈঠকটি হওয়ার কথা ছিল। বৈঠকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুললে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য একটি অস্থায়ী নতুন পথ নিয়ে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। তবে আরব দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব এবং ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রযাত্রায় সৌদি আরবের ক্ষোভের কারণে শেষ মুহূর্তে বৈঠকটি স্থগিত করা হয়। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যিদ বদর আলবুসাইদি বলেন, ঐকমত্যের স্বার্থে বৈঠকটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি সামাজিক মাধ্যম এক্সে বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতা নিশ্চিত করতে সংলাপ অব্যাহত রাখার বিষয়ে ওমান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ওমানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানায়, গঠনমূলক সংলাপের উপযোগী পরিবেশ তৈরির জন্য বৈঠকটি পরবর্তী তারিখে নেওয়া হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ইয়েমেনে চলমান ঘটনাবলির কারণে বৈঠকটি বাতিল হয়েছে। তার ভাষ্য, ইরান ও ওমান হরমুজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি দায়িত্বশীল পদ্ধতিতে পৌঁছানোর জন্য যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বৈঠকটি হলে নতুন নীতি নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হতো। তবে কোনো বাইরের শক্তির চাপ বা নির্দেশ ইরান মেনে নেবে না বলেও তিনি জানান।বাহরাইন জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কোনো ফি বা অনুমতির বাধা থাকা উচিত নয়। দেশটি বলেছে, প্রণালিতে নৌ চলাচলসংক্রান্ত যে কোনো ব্যবস্থায় জিসিসির সব সদস্যকে যুক্ত করতে হবে। এ ধরনের ব্যবস্থা ১৯৮২ সালের জাতিসংঘ সমুদ্র আইন সনদের ভিত্তিতে এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার অনুমোদন নিয়ে হতে হবে। বাহরাইন একই সঙ্গে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হুথিদের হামলার নিন্দা করেছে এবং ইরান আয়োজিত বৈঠকে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
হরমুজ নিয়ে প্রস্তাবিত বৈঠকটি দুই বছরের মধ্যে ইরান ও প্রধান জিসিসি দেশগুলোর মধ্যে প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। প্রস্তাবিত অস্থায়ী নৌপথটি পুরোপুরি ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা থাকায় এর মাধ্যমে প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় উঠে এসেছে।তবে বৈঠক হলেও হরমুজ প্রণালি তাৎক্ষণিকভাবে খুলে যাওয়ার কথা ছিল না। তেহরান প্রণালি পুনরায় খোলার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের তেলবন্দর অবরোধ তুলে নিতে, ইরানের বিপুল পরিমাণ জব্দ সম্পদ ফেরত দিতে এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠাসহ কয়েকটি শর্ত দিয়েছে।যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত চুক্তি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান জানায়নি। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে হরমুজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে দাবি করেছেন। জাহাজ চলাচলকারী কোম্পানিগুলোর দেওয়া তথ্যের সঙ্গে তার এ দাবির মিল নেই।
হরমুজ নিয়ে কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে। সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকার হুথিদের দখলে যাওয়া পশ্চিম উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী আল-মোখা পুনর্দখলের চেষ্টা করছে। হুথিরা গত সপ্তাহে হোদেইদা বন্দর থেকে পশ্চিম উপকূল ধরে দ্রুত অগ্রসর হয়ে আল-মোখা এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির ভেতরের কৌশলগত মায়ুন দ্বীপ দখল করে।এর পর সোমবার হুথিরা দক্ষিণ লোহিত সাগরের আরও দুটি কৌশলগত দ্বীপ গ্রেটার হানিশ ও লেসার হানিশ দখল করেছে বলে ইয়েমেনি সরকারি কর্মকর্তা ও হুথি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। দ্বীপ দুটি বাব আল-মান্দাব থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার উত্তরে। কয়েক শ সরকারি বাহিনীর মিত্রসেনা দ্বীপপুঞ্জ থেকে সরে যাওয়ার পর সেখানে হুথিরা যোদ্ধা মোতায়েন করে।এর ফলে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়েছে। বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগরকে এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং কৌশলগত গুরুত্বের দিক থেকে হরমুজ প্রণালির পর গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হিসেবে বিবেচিত।হুথিরা বলেছে, তারা লোহিত সাগরে সব বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে চায় না; তাদের লক্ষ্য মূলত সৌদিসংশ্লিষ্ট জাহাজ। একই সঙ্গে পশ্চিম উপকূলে তাদের নিয়ন্ত্রিত বন্দরগুলোতে কম ফি নেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে দক্ষিণে এডেনভিত্তিক সরকারের নিয়ন্ত্রিত বন্দর থেকে জাহাজের যাতায়াত নিজেদের বন্দরের দিকে টানার চেষ্টা করছে তারা।ইরান দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের সমর্থন দিয়ে আসছে। তবে হুথিরা তেহরানের নির্দেশে সরাসরি পরিচালিত হয় না এবং নিজেদের স্বাধীন কর্মকৌশলও রয়েছে। তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ইয়েমেন থেকে সৌদি আরবকে সরিয়ে দিয়ে দেশটির পুরো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।