সভ্যতার প্রথম দার্শনিক বলে বিবেচিত মাইলেতাসের থেলিসকে তাঁর দারিদ্র্য এবং কথিত অকেজো এই দর্শন পেশার জন্য উপহাস করা হতো। তিনি একসময় আকাশের গতিপ্রকৃতি দেখে বুঝেছিলেন যে জলপাইয়ের ফলন ভালো হতে যাচ্ছে। এরপর, তিনি নীরবে আশপাশের সব জলপাই পেষার কল ভাড়া নিয়ে তিনি বিপুল অর্থ উপার্জন করেছিলেন। থেলিস দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, দার্শনিকরা চাইলেই ধনী হতে পারেন, যদিও সম্পদ তাঁদের আগ্রহের বিষয় নয়। তার প্রায় আড়াই হাজার বছর পর বিশ্ববাজার অবশেষে থেলিসের দর্শনের মর্মার্থ এবং পেশার গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আতঙ্ক প্রায়শই এই প্রশ্নের উপর কেন্দ্রীভূত হচ্ছে যে, এই যন্ত্র একপর্যায়ে আমাদের প্রতিস্থাপন বা হত্যা করবে কিনা। যন্ত্র তথ্য খুঁজে বের করা, তাৎক্ষণিক সারসংক্ষেপ তৈরি এবং ইতিমধ্যে বলা কথাগুলোকে পুনর্বিন্যাস করার কাজে অসাধারণ। কিন্তু, তাদের বিচারবোধ নেই—এমন এক ক্ষমতা, যা গড়ে তুলতে দর্শনসহ বছর ধরে মানুষকে অর্জন করতে শিখিয়ে যাচ্ছে।
কারণ, বিচারবোধ কোনো গাণিতিক হিসাব-নিকাশ নয়। এর অর্থ হলো গুরুত্ব মেপে দেখা, পার্থক্য করার ক্ষমতা, কোনো উত্তর কেবল সঠিক না হয়ে সত্য কিনা তা অনুভব করার ক্ষমতা। এতে রুচি, বিচক্ষণতা ও গতানুগতিক পথের বাইরে ভাবার ক্ষমতা জড়িত, যা অভিজ্ঞতা, ভুল, বিব্রতকর মুহূর্ত, একঘেয়েমি, শোক, এমনকি মাঝেমধ্যে নেশার ঘোর কাটার মধ্য দিয়েও পরিশীলিত হয়।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে থাকা প্রশ্নগুলো নিছক প্রকৌশলগত সমস্যা নয়:
যন্ত্রের কী বলা উচিত শোকাহত বা একাকী কাউকে, কিংবা ভোর চারটায় নিঃসঙ্গতার মধ্যে বার্তা লিখছেন এমন কাউকে? এর চরিত্র অকপট, তোষামোদপূর্ণ, এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাসম্পন্ন নাকি দয়ালু হওয়া উচিত?যন্ত্র কি কষ্ট পেতে পারে? যদি পারে, তাহলে তার কাছে কি আমাদের কোনো দায় থাকবে? যন্ত্রপ্রকৌশলীরা বুঝতে পেরেছেন যে, কম্পিউটারের গাণিতিক ক্ষমতা দিয়ে এসব প্রশ্নের মীমাংসা করা যায় না। নৈতিকতা ইন্টারনেট থেকে সোজা সংগ্রহ করেই ধারণ করা যায় না। বরং ইন্টারনেট এ বিষয়ে আমাদের একমত হওয়ার ক্ষেত্রে চলমান ব্যর্থতার একটি নথি।
এখন, এআই নির্মাতারা দার্শনিকদের নিয়োগ দিতে শুরু করেছে।
‘অ্যানথ্রোপিক’ আমান্ডা আস্কেলের মতো বেশ কয়েকজন দার্শনিককে নিয়োগ দিয়েছে, যার মূল গবেষণায় “অসীম নৈতিকতা”—অর্থাৎ অসীম মূল্যের এক মহাবিশ্বে কীভাবে নীতিবান থেকে কাজ করা যায়, তা পরীক্ষা করা হয়েছে এবং যার দায়িত্ব হলো নিয়োগকর্তার এআই-এর চরিত্র গঠন করা। ‘গুগল ডিপমাইন্ড’ কেমব্রিজের দার্শনিক হেনরি শেভলিনকে “দার্শনিক” পদে নিয়োগ দিয়েছে। ‘চ্যাটজিপিটি’-এর নীতিমালা প্রণয়নের সময় ওপেনএআই “শত শত নীতি দার্শনিকের” সাথে পরামর্শ করেছে।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও পুরোনো একটি পরিহাস। দর্শনশাস্ত্রের ইতিহাসে নথিভুক্ত প্রথম প্রযুক্তিগত আতঙ্কটি ছিল কৃত্রিমভাবে স্মৃতি ধরে রাখাকে ঘিরে, ঠিক যে জিনিসটিতে এখন যন্ত্রগুলো পারদর্শী। প্লেটোর “ফেদ্রাস” সংলাপে সক্রেটিস বর্ণনা করেছেন কিভাবে লেখার উদ্ভাবক থিউথ মিশরের দেবরাজ থামুসের কাছে লেখনিকে স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর “ফার্মাকন” বা ওষুধ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু, থামুস সতর্ক করেছিল যে, লেখনি মানুষের মনে বিস্মৃতি ঢুকিয়ে দেবে: মানুষ বাহ্যিক নথির ওপর নির্ভর করবে, নিজের ভেতরে মনে রাখার অভ্যাস হারাবে এবং প্রকৃত অর্থে জ্ঞানী না হয়েও “জ্ঞানী” বলে খ্যাতি অর্জন করবে। গ্রিক শব্দ ফার্মাকন অর্থ ওষুধ, আবার বিষও। আর থামুসের সতর্কবাণীও রয়ে গেছে, কারণ প্লেটো তা লিখে রেখেছিলেন।
ফেদ্রাসের আলোকে দেখলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো আপাত সমাধান নয়; বরং বাহ্যিক স্মৃতির চূড়ান্ত পরিণতি। এটি এমন এক স্মৃতিযন্ত্র, যা কিছুই ভোলে না; বিপরীতে, মানুষ বিস্মৃতিপ্রবণ প্রাণী। ভুলে যাওয়ার ফলে জীবনে অভিজ্ঞতা হজম হয় এবং ক্ষমা, ঘুম, প্রফুল্লতা, দ্বিতীয় বিয়ে, এমনকি হেরে চলা ফুটবল দলকে সমর্থন করে যাওয়ারও অবকাশ তৈরি হয়। যে কিছুই ভুলতে পারে না, সে অতিবুদ্ধিমান নয়, বরং সে নিজেরই স্মৃতিভাগাড়ের নিচে জীবন্ত চাপা পড়া এক ধ্বংসস্তূপ।
এআই সবকিছু মনে রাখে, কিন্তু যেহেতু এটির কাছে একটি স্মৃতি অন্যটির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাই এটি শোক করতে, ক্ষমা করতে বা ছেড়ে দিতে পারে না। এবং ঠিক এই কারণেই এআই-এর যুগে দর্শনের গুরুত্ব কমছে না, বরং বাড়ছে। চিন্তা করা মানে সবকিছু সঞ্চয় করা নয়; বরং কী রাখতে হবে, কী বাদ দিতে হবে, কী নিয়ে হাসতে হবে বা কী বাতিল করতে হবে, তা স্থির করা। যন্ত্র যেকোনো কিছু তৈরি করতে পারে। কিন্তু কোনটির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তা বিবেক বা বিচারবোধসম্পন্ন কাউকে না কাউকে স্থির করতেই হয়, এবং সেই বিচারবোধের অস্তিত্ব এআই’র প্রশিক্ষণ-তথ্যের কোথাও পাওয়া যায় না।