শ্রমিকেরা আল্লাহর বন্ধু। শ্রমজীবী মানুষকে আল্লাহর রঙে রঙিন করা এবং ইসলামী আন্দোলনের সত্য ও মুক্তির পথে নিয়ে আসাই আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শ্রমিক জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করতে পারলেই ইসলামী আন্দোলনের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি বলেন, সমাজের সবচেয়ে বেশি সুবিধাবঞ্চিত ও দুঃখী মানুষেরাই শ্রমিক। দেশের উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও অর্থনীতিতে শ্রমিকদের অবদান সবাই স্বীকার করলেও অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে তারা সবসময় বঞ্চিত থাকে। শ্রমিকের অধিকারের প্রশ্ন এলে কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায় না। স্বাধীনতার পর বহু সরকার ক্ষমতায় এলেও শ্রমিকবান্ধব শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
প্রধান অতিথি বলেন, অতীতে যারা শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তারাও শ্রমিকদের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারেননি। কারণ তারা মানব রচিত মতবাদ—পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারার অনুসারী ছিলেন। ফলে শ্রমিকের শোষণ, বঞ্চনা ও নির্যাতনের অবসান ঘটেনি। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে এবং শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের আন্দোলন মূলত ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন। ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমেই শ্রমিক সমস্যার সমাধান করতে হবে। ইসলামী আন্দোলনের গণভিত্তি শক্তিশালী করতে হলে শ্রমিক ময়দানে আরও বেশি ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে ট্রেড ইউনিয়নভিত্তিক শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন অন্যতম বৃহৎ সংগঠন। প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে পেশাভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়নকে শক্তিশালী করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন ১৯৬৮ সালের ২৩ মে প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় শ্রমিক ময়দান ছিল বামপন্থী সংগঠনগুলোর প্রভাবাধীন। ইসলামী আন্দোলনের অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত করা এবং শ্রমিকদের বামপন্থী চিন্তার প্রভাব থেকে বের করে আনার লক্ষ্যেই ব্যারিস্টার কুরবান আলীর নেতৃত্বে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়।
কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেন, দীর্ঘ ৫৭ বছরের পথচলায় অসংখ্য ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে ছোট্ট একটি সংগঠন আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। শ্রমিক ময়দানে একটি নতুন ধারা সৃষ্টি হয়েছে এবং ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক শ্রমিক আন্দোলনের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
তিনি বলেন, এত দীর্ঘ সময় কাজ করেও বাংলাদেশের শ্রমিকদের ভাগ্যের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটেনি। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন করা, কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকারই শ্রমিকদের ভাগ্যোন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। শিল্প-কারখানা ও অর্থনীতির উন্নয়ন হলেও শ্রমিকদের জীবনমান সেই অনুপাতে উন্নত হয়নি।
আতিকুর রহমান বলেন, দেশের উন্নয়নের পেছনে শ্রমিকরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি। একদিকে রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর ব্যর্থতার কারণে শ্রমিকদের অধিকার আজও উপেক্ষিত।
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সরকারের আমলে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনকে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশেষ করে স্বৈরাচারী শাসনের ১৫ বছরে সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালানো হয়েছে, মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। ফলে শ্রমিকদের পক্ষে যে কার্যকর ভূমিকা রাখার কথা ছিল তা অনেকাংশে সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত অনেক শ্রমিক সংগঠনের নেতারা শ্রমিকের স্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এর ফলে শ্রমিক ময়দান আজ নেতৃত্ব সংকটে ভুগছে। অসৎ ও সুবিধাবাদী নেতার সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু প্রকৃত কল্যাণকামী নেতৃত্বের অভাব রয়েছে।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেন, বর্তমানে সংগঠনটি দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির শ্রমিক সংগঠন হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। অতীতে শ্রমিক লীগ ও শ্রমিক দল সরকারে ও বিরোধী দলে থাকলেও এবার প্রথমবারের মতো শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন এ অবস্থানে এসেছে। ফলে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগঠনের দায়িত্ব ও কর্মপরিধি আরও বেড়েছে।
তিনি বলেন, দেশের সাড়ে সাত কোটি নারী-পুরুষ শ্রমিক নানাভাবে বৈষম্যের শিকার। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে এখনই সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করে এগিয়ে যেতে হবে।
মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, বিএনপি ভোটের পূর্বে দেশে মদিনার শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছিল। আমরা সেই কথা তাদেরকে স্মরণ করে দিতে চাই। মদিনার ইসলাম কায়েম করতে হলে রাসূল (সা.) এর সুন্নাহকে মনে রাখতে হবে এবং খেলাফতে রাশেদার সুন্নাহকে ধারণ করতে হবে। হাদিসে এসেছে 'ফিসুন্নাতি ওয়া সুন্নাতিল খুলাফায়ির রাশিদিনাল মাহদিয়্যিন'। হেদায়েত পেতে হলে, সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে হলে আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহর মধ্যে এবং খেলাফতে রাশেদার সুন্নাহর মধ্যেই হেদায়েত খুঁজতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রকারী আপনাকে কুমন্ত্রণা দিচ্ছে। তাদের কথায় চললে আপনি বিভ্রান্ত হবেন। ভুলভাল বলবেন। নিজের মর্যাদা হানি করবেন। দেশ ও জনগণকে লজ্জিত করবেন। আমরা এইরকম অবস্থা চাই না। আপনি ১৮ কোটি মানুষের প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের পরিপূর্ণ সীমার প্রধানমন্ত্রী। কাজেই বাংলাদেশের সকল মানুষের মর্যাদা, দেশের মর্যাদা রক্ষা করা হচ্ছে আপনার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে শুরু করে সর্বত্র আবার ফ্যাসিবাদের দোসরদেরকে প্রতিষ্ঠা করার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। সেই বিষয়েও আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে এস এম লুৎফর রহমান বলেন, দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও প্রধান সমুদ্রবন্দরনির্ভর নগর হওয়া সত্ত্বেও চট্টগ্রামকে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন ও বরাদ্দের ক্ষেত্রে বঞ্চিত করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে চট্টগ্রাম বন্দরকে লুটপাটের কেন্দ্র বানানো হয়েছিল এবং বর্তমানে টেন্ডার ছাড়াই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে, যা শ্রমিক-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিহত করা হবে।
তিনি বিপিসির কেন্দ্রীয় কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের যেকোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করেন এবং দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনের দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, নিষিদ্ধ শ্রমিক লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম থেকেই দেশব্যাপী জাগরণ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
নগরীর সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব চৌধুরী'র সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন নগরীর সহ-সভাপতি নজির হোসেন ও মকবুল আহমেদ ভূঁইয়া প্রমুখ।