নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্লোগানে ৩১টি নীতিসংবলিত রূপরেখা ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে দিনব্যাপী পলিসির সামিটে তা প্রকাশ করা হয়। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, নির্বাচনে জয়ী হলে এই রূপরেখায় সরকার চলবে। নির্বাচনী ইশতেহার পৃথকভাবে ঘোষণা হবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে।সুশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ ছয়টি ভাগে এই ৩১ দফা নীতি ঘোষণা করেছে জামায়াত। পৃথক সেমিনারে এসব বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী ও শিক্ষাবিদরা।পলিসি সামিটের উদ্বোধন অধিবেশনে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মানবিক মর্যাদাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখা হবে। দেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ টিকে থাকা নয়, বরং স্থিতিশীলতা। জামায়াতের রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি বিভাজনের নয়; আশা, শান্তি এবং ঐক্যের হবে।
কী রয়েছে রূপরেখায় রূপরেখার প্রথমে রয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। ট্যাক্স ধাপে ধাপে কমিয়ে ১৯ শতাংশ ও ভ্যাট ১০ শতাংশ নির্ধারণ। স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালু; যাতে এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা একই সঙ্গে থাকবে। তিন বছরে শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ বাড়ানো হবে না। বন্ধ কলকারখানা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে চালু করা, সেখানে শ্রমিকদের ১০ শতাংশ মালিকানা থাকবে। লাইসেন্স ব্যবস্থা সহজ করা হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ সুবিধা থাকবে।শিক্ষা-সংক্রান্ত ছয়টি নীতিতে বলা হয়েছে, স্নাতক শেষে পাঁচ লাখ ডিগ্রিধারীকে মাসে দুই বছর সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হবে। মেধার ভিত্তিতে এক লাখ শিক্ষার্থীকে মাসে ১০ হাজার টাকা করে শিক্ষাঋণ দেওয়া হবে। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার জন্য প্রতিবছর ১০০ শিক্ষার্থী সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ পাবেন।
স্বাস্থ্যসেবার নীতিতে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। ৬৪ জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল করা হবে। গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর বয়স দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও সন্তানের প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।কর্মসংস্থান ও তারুণ্যের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রতিটি উপজেলায় ইয়ুথ টেক ল্যাব এবং প্রতিটি জেলায় জব ইয়ুথ ব্যাংক গঠন করে পাঁচ বছরে ৫০ লাখ চাকরি নিশ্চিত করা হবে। নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে পাঁচ লাখ উদ্যোক্তা, ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হবে।তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রূপরেখায় ভিশন-২০৪০ ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত। ২০৩০ সালের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তিতে ২০ লাখ চাকরি তৈরি, ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন, আইসিটিতে রপ্তানি পাঁচ বিলিয়নে উন্নীতকরণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে রূপরেখায়।দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে আগামী সাত বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় তিন গুণ করা এবং বাংলাদেশি পেশাজীবী, গবেষক, শিক্ষকদের দেশে আনতে ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স নীতি প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত।
নারীকে ছাড়া টেকসই সমৃদ্ধি সম্ভব নয় জামায়াত আমিরের বক্তব্যে জোর ছিল নারীর কর্মসংস্থানে। তিনি বলেছেন, নারীরা এখনও কাঠামোগত বাধায় রয়েছে। কর্মে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি শুধু ন্যায়ের প্রশ্ন নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজন। জনসংখ্যার অর্ধেককে পূর্ণাঙ্গ অন্তর্ভুক্ত না করে টেকসই সমৃদ্ধি সম্ভব নয়।নারীদের বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ আখ্যা দিয়ে শফিকুর রহমান বলেছেন, ৩৭ শতাংশ নারী আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে যুক্ত, যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম উচ্চহার। এই হার দ্রুত বৃদ্ধি করতে চাই। উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত নারীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।শফিকুর রহমান জানান, জামায়াতের ৪৩ শতাংশ সদস্য নারী। তিনি বলেছেন, তাই জামায়াত গর্বিত। জামায়াত এমন সুযোগ সৃষ্টিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে কোনো মেয়ে পিছিয়ে না থাকে। নতুন বাংলাদেশে সমান নাগরিক হিসেবে তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশ করতে পারে।শফিকুর রহমান বলেন, শুধু প্রবৃদ্ধি নয়; অর্থনৈতিক সাফল্য এমন হওয়া উচিত, যাতে মানুষ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবনের পরিকল্পনা করতে পারে, মর্যাদার সঙ্গে পরিবার পরিচালনা করতে পারে এবং সমাজে অর্থবহভাবে অংশ নিতে পারে।শফিকুর রহমান বলেন, লাখো প্রবাসী শ্রমিক তাদের শ্রম ও ত্যাগের মাধ্যমে গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দিচ্ছেন। তারা দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে আরও বড় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।