ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার রোমাঞ্চ এবং একটি গণতান্ত্রিক আগামীর স্বপ্নে বিভোর দেশ। প্রায় দেড় যুগ পর আবারও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশের আবহ তৈরি হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে চলবে টানা বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।এই নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের শাসনভার কার হাতে থাকবে। এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই জাতীয় সনদ সংস্কারের প্রশ্নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন। এরপর সরকারের নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং পরে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধন স্থগিত হওয়ায় এবারের নির্বাচনে নেই আওয়ামী লীগ।ইসি সূত্রে জানা গেছে, দেশের ২৯৯ সংসদীয় আসনে ভোট গ্রহণের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। দেশে প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। সাদা ব্যালটে সংসদ সদস্য নির্বাচন এবং গোলাপি ব্যালটে রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে নাগরিকরা তাদের রায় জানাবেন। ভোটকেন্দ্রে শান্তি বজায় রাখতে এবং যে কোনো বিশৃঙ্খলা রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন। সারাদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েক লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যালট পেপার ও নির্বাচনী সরঞ্জাম গতকাল বিকেলের মধ্যেই কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। শান্তি ও গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা< রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই চলছে। কিন্তু বারবার হোঁচটও খেতে হয়েছে। রাজধানীর ফার্মগেটের বাসিন্দা হাসানাত আরেফিন বলেন, এবারের ভোট শুধু একজন নেতা নির্বাচন নয়; শান্তি আর টেকসই গণতন্ত্রে পৌঁছাতে চাই। দীর্ঘ সময় পর নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারছি এটাই বড় স্বস্তি। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের প্রচারণার শেষ মুহূর্তে সাধারণ মানুষকে নির্ভয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য এক বড় পরীক্ষা। অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বহির্বিশ্বেও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলগুলো ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে।গতকাল সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোট সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক করতে তাঁর নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তার কথা তুলে ধরেন। রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং সাধারণ ভোটারের প্রতি শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ ভোটের পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি। এর আগে দুপুরে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের ব্রিফিংয়ে ইসির সার্বিক প্রস্তুতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ভোট গণনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনিয়ম বিতর্ক ও অভিযোগ আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান করবে ইসি।তবে ভোটের আগের দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে টাকার ছড়াছড়ি ও পেশিশক্তির ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ ছড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থীর সমর্থকরা টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা চালিয়েছেন।এ পরিস্থিতিতে গতকাল রাতে নির্বাচন কমিশন এক বিবৃতিতে বলেছে, একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোট কেনাবেচা হচ্ছে। ভোট কেনাবেচা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় গতকাল দিনভর সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল সংখ্যক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ গোটা দেশে মোটরসাইকেল, গাড়িসহ যানবাহনে ব্যাপক তল্লাশি চলেছে। এরই মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোট দিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাওয়ায় ঢাকা নগরী এখন প্রায় ফাঁকা।এদিকে নির্বাচনী কাজে অসহযোগিতার অভিযোগে ঢাকা-১০ আসনের ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যক্ষ অধ্যাপক এমএ মজিদকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা-১৬ আসনের পল্লবীতে মিরপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে অনুপ্রবেশ এবং প্রভাব বিস্তারের দায়ে জামায়াত সমর্থক পোলিং অফিসারসহ দুজনকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।এ পরিস্থিতিতেও প্রধান প্রধান দল ও জোটের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ থেমে নেই। বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের নেতারা পরস্পরের বিরুদ্ধে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছেন। গতকাল বিএনপি ও জামায়াত নেতারা নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে গিয়ে এমন অভিযোগ করেন।গত ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের তপশিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। ৩০০ আসনের তপশিল ঘোষণা হলেও জামায়াতের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়। ফলে আজ ২৯৯ আসনে নির্বাচন হচ্ছে।
নির্বাচনে ইসির নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫০টি অংশ নিচ্ছে। ২৯৯ আসনে মোট প্রার্থী ২ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে দলীয় ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। নারী প্রার্থী আছেন ৮৩ জন।সারাদেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১; নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ১ হাজার ২৩২ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৭৭৯টি। ভোটকক্ষের (বুথ) সংখ্যা ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি। গড়ে প্রতি ৩ হাজার ভোটারের জন্য একটি ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। ইসি ২১ হাজার ৫০৬ কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ তথা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।