চাঁদপুরের পথে প্রধানমন্ত্রীসন্ধ্যার মধ্যে ৭ জেলায় বজ্রসহ বৃষ্টির আভাস, সতর্কসংকেতমুমিনুল-তানজিদে প্রতিরোধ গড়ছে বাংলাদেশদেশের আবহাওয়ায় চরম ভাব বাড়বেইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে চীন: ট্রাম্প
No icon

দেশের আবহাওয়ায় চরম ভাব বাড়বে

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়া বদলে যাচ্ছে। ঋতুচক্র স্বাভাবিক থাকছে না। শীতকাল ছোট হয়ে আসছে, কিন্তু শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে। গ্রীষ্মকাল দীর্ঘ হচ্ছে, তাপমাত্রা বাড়ছে। বর্ষার আগেই বৃষ্টি ঝরছে, আবার কম সময়ে বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। দেখা দিচ্ছে আকস্মিক বন্যা। আবার দেশের কোথাও খরা হচ্ছে, মাটি শুকিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই পৃথিবীতে সক্রিয় হতে যাচ্ছে এল নিনো । এতে দেশের আবহাওয়ায় চরম ভাব দেখা দিতে পারে।আন্তর্জাতিক আবহাওয়া ও জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো বলছে, এ বছরের মাঝামাঝি থেকে সক্রিয় হতে পারে এল নিনো। বিভিন্ন আবহাওয়া মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে, এটি শক্তিশালী বা সুপার এল নিনো তে রূপ নিতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো সক্রিয় হলে বাংলাদেশে বর্ষাকাল বিলম্বিত হতে পারে। বর্ষায় বৃষ্টিপাত কমতে পারে। ঘন ঘন তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। তাই এটি অর্থনীতি, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র হলো এল নিনো। পৃথিবীতে ২ থেকে ৭ বছর পরপর এটা ফিরে আসে। এক বছর পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। বাংলাদেশ সরাসরি প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে না থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ু এই বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এতে দক্ষিণ এশিয়া তথা বাংলাদেশ এল নিনোর প্রভাববলয়ে চলে আসতে পারে।

বাংলাদেশের আবহাওয়ায় এল নিনোর প্রভাব

স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাংশ অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা থাকে এবং পশ্চিমাংশে বেশি বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু এল নিনো সক্রিয় হলে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠ অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠে। এই উষ্ণতা বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহের স্বাভাবিক ভারসাম্য বদলে দেয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এল নিনো সক্রিয় হলে বাংলাদেশের বর্ষাকালের আগমন বিলম্বিত হতে পারে। একই সঙ্গে বর্ষায় বৃষ্টিপাত কমতে পারে। তবে এর প্রভাব সরাসরি নয়, এটি টেলিকানেকশন বা দূরবর্তী জলবায়ুগত সম্পর্কের মাধ্যমে আসে। তিনি বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গেলে এবং ট্রেড উইন্ড বা বাণিজ্যিক বায়ুর গতি দুর্বল হলে দক্ষিণ এশিয়ার বৃষ্টিপাতের ধরনও বদলে যেতে পারে।

বাংলাদেশে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের বড় কারণ ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা। ওই বছর দেশের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ তাপপ্রবাহ দেখা যায়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, টানা ৩৬ দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছিল। চুয়াডাঙ্গা, যশোর, পাবনা, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা, ময়মনসিংহসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তাপদাহে পুড়েছিল। তীব্র গরমে স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছিল। বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হাসপাতালে বেড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, রিকশাচালক ও নিম্ন আয়ের মানুষ।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার যদি শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হয়, তাহলে আরও দীর্ঘ তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেন, এল নিনো শক্তিশালী হলে মৌসুমি তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ফলে ঘন ঘন তাপপ্রবাহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে খরার ঝুঁকি

বাড়ছে বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বরাবরই খরাপ্রবণ। রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, রংপুর অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে গেলে দ্রুত খরা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো সক্রিয় হলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে এ অঞ্চলগুলো। বৃষ্টি কম হলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়বে। সেচনির্ভর কৃষিতে ব্যয় বাড়বে। নদী, খাল-বিল শুকিয়ে যেতে পারে। পানীয় জলের সংকটও বাড়তে পারে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মারুফুর রহমান বলেন, এল নিনোর কারণে সমুদ্র থেকে স্বাভাবিক আর্দ্রতার প্রবাহ ব্যাহত হয়। ফলে দীর্ঘ শুষ্ক সময় বা খরা দেখা দিতে পারে।

বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তনের ধাক্কা কৃষিতে

বাংলাদেশের কৃষি এখনও প্রকৃতিনির্ভর। আমন ধান পুরোপুরি বর্ষার পানির ওপর নির্ভরশীল। আবার বোরো ধানে লাগে বিপুল সেচ। ফলে বৃষ্টিপাতের ধরনে সামান্য পরিবর্তনও কৃষিতে বড় প্রভাব ফেলে।কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো সক্রিয় হলে তিন ধরনের ঝুঁকি একসঙ্গে দেখা দিতে পারে বর্ষা দেরিতে শুরু হওয়া, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং হঠাৎ অতিবৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টি কম হলে আমনের চারা রোপণ ব্যাহত হবে। দীর্ঘ খরায় জমি শুকিয়ে যাবে। আবার দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের পর হঠাৎ অতিবৃষ্টি হলে ক্ষেত তলিয়ে যাবে। ফলে ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, সরিষা, শাকসবজি ও ফলসহ সব ধরনের ফসল ঝুঁকিতে পড়তে পরে।