দুপুরের মধ্যে ৬ জেলায় বজ্রবৃষ্টির শঙ্কাবেতন কাঠামোর প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে আজযেসব এলাকায় বিদ্যুৎ যেত না, সেখানেও লোডশেডিং পে স্কেলের গেজেট নিয়ে সুখবর, সেপ্টেম্বরেই নতুন বেতনসাম্য ও দ্রোহের কবি নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকী আজ
No icon

যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ যেত না, সেখানেও লোডশেডিং

রাজধানীর বেইলি রোডে ৯ বছর ধরে বসবাস করছেন ইকরামুল কবির। এবারের মতো লোডশেডিং তিনি এই এলাকায় আগে কখনও দেখেননি। তাঁর মতে, আগের বছরগুলোতে মাঝে মাঝে লোডশেডিং হতো। পাশে মিন্টো রোডে মন্ত্রী-সচিবদের মতো দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বসবাস থাকায় দেশের অন্য এলাকা বা ঢাকার অন্যান্য অংশের মতো বিদ্যুতের বড় সংকট ছিল না। হয়তো প্রচণ্ড গরম পড়লে কয়েক দিন পর দু-একবার বিদ্যুৎ যেত। কিন্তু এবার চিত্র পুরো ভিন্ন। তিন-চার দিন ধরে নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে। গতকাল রোববার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চারবার বিদ্যুৎ গেছে। এর মধ্যে ৫-১০ মিনিট করে দুবার বিদ্যুৎ চলে যায়, আর দুবার এক ঘণ্টার কমবেশি লোডশেডিং হয়। রাতেও একাধিকবার বিদ্যুৎ যাওয়ার কথা জানান তিনি। রোববার ঢাকার পাঁচটি অঞ্চল, যেগুলোকে সাধারণত অভিজাত এলাকা বলা হয় এমন এলাকার সাতজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে ইকরামুল কবিরের অভিজ্ঞতার মতোই তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মতে, এবারের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা লোডশেডিংয়ের চিত্র থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

তবে বিষয়টি সে রকম নয় বলে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) একজন নির্বাহী পরিচালক জানান। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, এমনিতেই গ্রামে বেশি লোডশেডিং করার অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে ঢাকাতেও লোডশেডিং করা হচ্ছে। তবে এবার যেটা ব্যতিক্রম তা হলো, আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, যেখানে মন্ত্রী, সচিব বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা থাকতেন, সেখানে সাধারণত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া হতো। কিন্তু এবার সেই চিত্র পাল্টে গেছে। হাসপাতাল, কেপিআইভুক্ত এলাকা এবং শিল্প খাত ছাড়া সব এলাকায় প্রায় সমান হারে লোডশেডিং করা হচ্ছে। কেউ যেন বৈষম্যের শিকার না হয়, সরকার থেকে তেমনই নির্দেশনা রয়েছে।খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার মধ্যে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে দেশ। দুই দিন ধরে দিনের একটা বড় অংশে বিদ্যুতের ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া, বড় কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন হ্রাস এবং জ্বালানি তেলের সংকটে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে। এর প্রভাবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বিকেল ৪টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৬৭ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৯২৮ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় তিন হাজার ৬৩৯ মেগাওয়াট। বিকেল ৫টায় ঘাটতি ছিল তিন হাজার ২৯৭ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা ৬টায় ১৬ হাজার ২৮১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৭৪২ মেগাওয়াট; তখন ঘাটতি ছিল দুই হাজার ৫৩৯ মেগাওয়াট। এর আগে দুপুর ১২টায় ঘাটতি ছিল তিন হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট এবং দুপুর ২টায় তিন হাজার ৪৫১ মেগাওয়াট।

ঢাকাতেও লোডশেডিং

আগে ঢাকার অনেক এলাকায় লোডশেডিং তুলনামূলক কম হতো। বিশেষ করে রাজধানীর কিছু আবাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ অনেকটা নিরবচ্ছিন্ন রাখার অভিযোগ ছিল। কিন্তু এবার বিদ্যুতের ঘাটতি এতটাই বেড়েছে যে এসব এলাকাতেও দিনে তিন-চারবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে।ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু দিনের বেলাই নয়, সন্ধ্যা ও রাতেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাচ্ছে। এতে পানির পাম্প, ফ্রিজ, ফ্যান ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানো যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং অনলাইনে কাজও ব্যাহত হচ্ছে।রাজধানীর অপেক্ষাকৃত সুবিধাপ্রাপ্ত এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, ইস্কাটন, বারিধারা, বসুন্ধরা ও উত্তরা এলাকার বিভিন্ন অংশেও কয়েক দফা বিদ্যুৎ যাচ্ছে। এসব এলাকায় আগে সাধারণত লোডশেডিংয়ের চাপ কম থাকলেও এবার দিনে তিন-চারবার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে মিরপুর, মগবাজার, পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, রামপুরা, আজিমপুর, তেজগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনে পাঁচ-ছয়বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা।ধানমন্ডির ৭/১ নম্বর রোডের বাসিন্দা মাহীন সরকার বলেন, আগে এখানে লোডশেডিং খুব একটা হতো না। এখন দিনে তিন-চারবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কখনও আধা ঘণ্টা, তারও বেশি সময় থাকছে না। গরমে খুব কষ্ট হচ্ছে।গুলশান ১-এর বাসিন্দা ফাওজিয়া কবির একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, আগে এখানে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে মনে পড়ছে না। এখন দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ যাচ্ছে। জেনারেটর ও আইপিএস দুটি চালিয়েও পরিস্থিতি সামলানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে রাতে বিদ্যুতের আসা-যাওয়া ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।

বনানীতে বসবাসকারী তানিম চৌধুরী বলেন, আগে লোডশেডিংয়ের কথা তেমন ভাবতেই হতো না। এখন দিনের মধ্যে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বাসায় কাজ করা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানো সবকিছুতেই সমস্যা হচ্ছে।বারিধারায় বসবাসকারী ঐশী হক এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মাওন চৌধুরীও একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন।মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডের বাসিন্দা শাকিল হাসান বলেন, দিনে পাঁচ-ছয়বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। গরমে বাসায় থাকা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে গত মাস থেকে বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করা হচ্ছিল। কয়েক দিন ধরে লোডশেডিংয়ের কারণে বৈদ্যুতিক চুলাও ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না।মিরপুর শেওড়াপাড়া নিবাসী আয়েশা খাতুন বলেন, রোববার সকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত পাঁচবার বিদ্যুৎ গেছে। কখন বিদ্যুৎ থাকবে আর কখন যাবে তার কোনো ঠিক নেই। গরমে রাতে ঘুমানো যাচ্ছে না, বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে।যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা শামসুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প চালানো যাচ্ছে না। রান্না, পড়াশোনা, ঘরের কাজ সবকিছুতেই সমস্যা হচ্ছে। রাতের লোডশেডিংয়ে গরমে শিশুরা ঘুমাতে পারছে না।

গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ খাত

বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান জ্বালানি গ্যাস। তবে সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। পেট্রোবাংলার গতকাল সন্ধ্যা ৬টার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২৩২ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে ১৬১ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৭১ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট।বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে কয়লা সরবরাহেও সমস্যা রয়েছে। পায়রা, আদানি ও মাতারবাড়ীর মতো বড় কেন্দ্রগুলো থেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। গরমে চাহিদা বাড়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। সংকট সামাল দিতে সর্বোচ্চ উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে।

কয়লা ও তেলের সংকটেও উৎপাদন ব্যাহত

গ্যাসের পাশাপাশি কয়লার সংকটও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় চাপ তৈরি করেছে। ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্রও কয়লা সরবরাহের সমস্যায় উৎপাদন কমেছে। ফলে বাংলাদেশেও সরবরাহ কমে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রটি থেকে ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কম বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন ধরে রাখতে নানা সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বড় কেন্দ্রগুলো থেকে একসঙ্গে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিদ্যুৎ না পাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ঘাটতি সামাল দিতে পিডিবি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকটের কারণে সব কেন্দ্র প্রয়োজন অনুযায়ী চালানো যাচ্ছে না। ফলে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করেও ঘাটতি পুরোপুরি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।