ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ১৬ দিন। এবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিধিনিষেধের কারণে দেয়ালে দেয়ালে নেই পোস্টার; নেই মাইকের গগনভেদি শব্দ। ডিজিটাল অ্যালগরিদমে চলছে ভোটের প্রচার। পোস্টার আর মাইকের স্থান দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোনের স্ক্রিন। মাঠের প্রচারের চেয়েও বড় লড়াইয়ের ময়দান এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির বার্তা, ভিডিওতে ছেয়ে গেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে ভাইরাল হচ্ছে নির্বাচনী গান, শর্ট ভিডিও ও গ্রাফিক কনটেন্ট। এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া বক্তব্য, বিকৃত ভিডিও ও বিদ্বেষমূলক কনটেন্টও কম নয়, যা বাড়িয়ে তুলছে রাজনৈতিক উত্তেজনা।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নির্বাচনী পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে প্রভাবিত করতেই কনটেন্ট বেশি তৈরি করা হচ্ছে। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অনেকেই প্রচারের জন্য ডিজিটাল টিম গঠন করেছেন। ফেসবুক বুস্টিং, ইউটিউব বিজ্ঞাপন, টিকটক ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিংয়ে তথা অনলাইন প্রচারণায় ঢালা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি তানভীর হাসান জোহা বলেন, ডিজিটাল প্রচারণা দ্রুত ও লক্ষ্যভিত্তিক যোগাযোগের সুযোগ করে দেয়। ফলে ভোটের প্রচারে সামাজিক মাধ্যম রণক্ষেত্রে রূপ নিচ্ছে। সমাধান হিসেবে ভেরিফায়েড অ্যাড লাইব্রেরি, রিয়েল-টাইম মনিটরিং ও স্বচ্ছতা বাধ্যতামূলক করা দরকার। একই সঙ্গে ভুয়া কনটেন্ট দমনে দ্রুত টেকডাউন ও ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো জরুরি। এআই ও ডিপফেক শনাক্তে এআই-ভিত্তিক ডিটেকশন টুল, ওয়াটারমার্কিং ও সোর্স অথেনটিকেশন কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত ফ্যাক্ট-চেকিং ও আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ডিজিটাল মার্কেটিং বিশ্লেষকরা বলছেন, তরুণ ভোটারদের টার্গেট
করে তৈরি ভিডিওগুলোতে আবেগ, ট্রেন্ডিং মিউজিক ও নাটকীয় উপস্থাপনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ধর্মভিত্তিক দলের প্রচারণাতেও তরুণদের আকৃষ্ট করতে ট্রেন্ডিং মিউজিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব নির্বাচনীয় গানের সঙ্গে নাচ বা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিসহ তৈরি হচ্ছে টিকটক ভিডিও। মুহূর্তে তা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ছে।ফার্মগেটের ব্যবসায়ী লিয়াকত হোসেন বলেন, ফেসবুক খুললেই নির্বাচনীয় গান আর প্রচার সামনে আসে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের টার্গেট করে এসব প্রচার চালানো হয়। এমনটা করবে না কেন? আমার কাজের মহিলার হাতেও স্মার্টফোন আছে। ফেসবুক-ইউটিউব চালায়। চোখের সামনে বারবার একজন প্রার্থীর প্রচার ভেসে এলে তার প্রতি একটা আগ্রহ তৈরি হয়।সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনীয় প্রচারণার বিভিন্ন বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট সাধারণ মানুষের কাছে সত্য হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। ফলে ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, বাড়ছে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সামাজিক বিভাজন।
নির্বাচনী প্রচারে প্রার্থী বা দলের ক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষকে অস্বস্তিকর বলেও মনে করছেন সামাজিক মাধ্যমের অনেক ব্যবহারকারী। ঢাকার বাড্ডায় বসবাসকারী স্কুলশিক্ষক আব্দুল গফুর খান গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, ফেসবুক খুললেই দেখি পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণ। রবিবার সকালে ফেসবুকে দেখলাম ভোট চাইতে যাওয়া এক নারীকে চোখ তুলে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। সামাজিক মাধ্যমকে মনে হয় যুদ্ধক্ষেত্র। বন্ধ করে দিতে চাই মাঝেমধ্যে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত করা হয় না।বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন তরুণ ভোটাররা। টিকটক, রিলস ও শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মে তরুণদের উপস্থিতি বেশি হওয়ায় দলগুলো সেখানেই সর্বাধিক বিনিয়োগ করছে। সহজ ভাষা, সে;াগানধর্মী বার্তা ও আকর্ষণীয় ভিজ্যুয়াল দিয়ে তরুণদের আবেগে নাড়া দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম বলেন, রাজনীতি ছিল আগে হাটে-মাঠে-ঘাটে। গ্রামের বাড়িতে প্রার্থীদের নির্বাচনী ক্যাম্পে চায়ের কাপে জমে উঠতো রাজনীতি। এখন রাজনীতি নিউজফিডেই বেশি দেখি। কে কী বলছে, সেটা অনেক সময় যাচাই করার সুযোগ পর্যন্ত থাকে না।সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবি দেখে অবিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর নিজের মতের সঙ্গে মিললেই এসব ভিডিও শেয়ার করছে মানুষ। মুর্হূতে নেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে উদ্ধৃত করে গণভোটে কেহ না ভোট দিলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে ফাঁসি দেওয়া হবে। শিরোনামে একটি ফটোকার্ড সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ফ্যাক্ট চেকে দেখ যায়, ফটোকার্ডটি ভুয়া।