পঞ্চদশ সংশোধনীর রায়ের বিরুদ্ধে করা সব আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপের বিধান অসাংবিধানিক ঘোষণার সিদ্ধান্ত বহাল থাকায় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালে আর কোনো সাংবিধানিক বাধা থাকল না। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ এ রায় ঘোষণার পর আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের মতে, ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের আগের রায় বাতিল হওয়ার পরই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে; নতুন করে এ ব্যবস্থা চালু করতে আলাদা কোনো আইন প্রণয়নেরও প্রয়োজন নেই। ফলে আদালতের সর্বশেষ রায়ে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক বিতর্কের অবসান ঘটার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নির্বাচন পরিচালনার কাঠামোও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সবশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে দেওয়া হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা সব আপিল খারিজ করে দেন সর্বোচ্চ আদালত। এর ফলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, গণভোটের বিধান পুনর্বহাল এবং সংবিধানের ৭(ক), ৭(খ) ও ৪৪(২) অনুচ্ছেদ-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বহাল থাকল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা সব আপিল খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। তিনি বলেন, হাইকোর্ট চারটি বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, গণভোটের বিধান পুনর্বহাল এবং সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বাতিল, সেগুলোই বহাল থাকল।আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করতে হলে আগে সংবিধানে সেই বিধান নতুন করে যোগ করতে হবে। পরবর্তী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
এ রায়ের পর সচিবালয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপির আন্দোলনের ফসল। রায়ে যেটা আছে, সেটা বিবেচনায় নিয়ে যা করলে ভালো হয়, সেটাই করব। এ ব্যাপারে জনগণের মতামত নেওয়া হবে। রায় পাওয়ার পরে সংবিধান সংশোধন কমিটি হবে, সেই আইনি প্রক্রিয়ায় যেভাবে আসে, সেভাবে রায়ের বাস্তবায়ন করা হবে।আইনমন্ত্রী বলেন, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হবে ইনশাল্লাহ। এটা আমাদের নির্বাচনী, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি।সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়কে বাতিল ঘোষণা করে ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর সর্বসম্মতিক্রমে রায় দেন আপিল বিভাগ। এর রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন হয়ে যায়।ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে ১৫ বছর আগে দেওয়া ওই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর ও এ-সংক্রান্ত রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন নিষ্পত্তি করে দেওয়া রায়ে বলা হয়, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সম্পর্কিত বিধানাবলি এই রায়ের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত ও সক্রিয় করা হলো। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত বিধানাবলি ভবিষ্যৎ প্রয়োগ যোগ্যতার ভিত্তিতেই কার্যকর হবে বলে রায়ে এসেছে।
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, আসলে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে। তবে রায়ে বলা হয়েছিল যে, যখন নির্বাচনকালীন প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ হবে তখন থেকে তা কার্যকর হবে। কিন্তু সেই সময় রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করতে পারেননি। কারণ তখন তিনি ছিলেন ড. ইউনূস সরকারের কন্ট্রোলে।তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালে নতুন করে কোনো আইন করার প্রয়োজন নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ধরেন এখন যে সরকার আছে, সেই সরকার যদি পদত্যাগ করে তাহলে পরবর্তী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে হবে। এ জন্য সংসদে নতুন করে কোনো আইন করার প্রয়োজন হবে না। তবে সংসদ যদি চায় যে, তত্ত্বাবধায় সরকারের যে ফর্মুলা আছে, উপদেষ্টা পাঁচজনের স্থলে ১০ জন করা, অন্যান্য ক্রাইটেরিয়া সেগুলো করতে পারে। তখন সংসদে আইন করে করতে হবে। সেই ক্ষমতা সংসদের আছে।আপিল বিভাগের রায়ের ফলে সবশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিই নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানান মনজিল মোরসেদ। আর পঞ্চদশ সংশোধনীর বিধান অসাংবিধানিক ঘোষণা হওয়ায় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় ফিরতে আর কোনো বাধা থাকল না বলে জানান এই আইনজীবী।
তিনটি আপিলই খারিজ : পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে মোট তিনটি আপিল করা হয়েছিল। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার ব্যক্তি একটি, নওগাঁর বাসিন্দা মো. মোফাজ্জল হোসেন পৃথক একটি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আরেকটি আপিল করেন।গত সোমবার ওইসব আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। মঙ্গলবার ও বুধবার টানা শুনানি শেষে আদালত গতকাল বৃহস্পতিবার রায়ের দিন ধার্য করেন। এরপর নির্ধারিত দিনে সব আপিল খারিজ করে রায় ঘোষণা করা হয়।সুজন সম্পাদকসহ চার ব্যক্তির পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেন, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন। এর ফলে হাইকোর্ট যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন, সেটি বহাল থাকল।