১৭ জেলায় ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কা, নদীবন্দরে সতর্কসংকেতসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য জরুরি নির্দেশনাফ্যাসিস্ট পতনের আন্দোলনের মিত্রদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজযে কারণে আর্জেন্টিনা-স্পেনের ফুটবলারদের ধাক্কাধাক্কিসাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালকে ফেরত চেয়ে দিল্লিকে ঢাকার চিঠি
No icon

বিক্ষোভ দমনে বিজেপি-আরএসএস, নারী আন্দোলনকারীদের যৌন হেনস্থা!

রাজধানী দিল্লিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের দমনপীড়ন ও 'নিট-ইউজি' প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত সোমবারের 'সংসদ অভিযান' কর্মসূচির পর থেকে বুধবার পর্যন্ত বিক্ষোভের আগুন কেবল রাজধানীর রাজপথেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, আছড়ে পড়েছে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা সংসদেও। এরই মধ্যে পুলিশের সাথে ব্যাজ ছাড়া বিজেপি-আরএসএস কর্মীদের যৌথ তাণ্ডব, নারী আন্দোলনকারীদের ওপর যৌন হেনস্থা এবং সাদা পোশাকে লাঠি হাতে সাধারণ মানুষের ওপর হামলার মতো বিস্ফোরক সব তথ্য সামনে উঠে এসেছে।


সংসদ ভবনের বাইরে এবং ভেতরে বিরোধীরা সরকারের এই কঠোর মনোভাবের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে সোচ্চার হয়েছেন। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এনে বলেন, “পুলিশের পোশাকের আড়ালে এবং তাদের সঙ্গে কোনো প্রকার ব্যাজ বা পরিচয়পত্র ছাড়াই বিজেপি এবং আরএসএস-এর ক্যাডাররা সরাসরি মাঠে নেমেছে। এরা পুলিশের মদদে শিক্ষার্থী এবং আন্দোলনকারীদের ভয় দেখাচ্ছে, হুমকি দিচ্ছে এবং পরোক্ষভাবে নির্যাতন চালাচ্ছে।”

প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, কেবল ইউনিফর্ম পরা পুলিশই নয়, বরং সাদা পোশাকে লাঠি হাতে একদল সশস্ত্র ব্যক্তিকে আন্দোলনকারীদের ওপর হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গেছে। শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থানরত সাধারণ নাগরিক ও শিক্ষার্থীদের হঠাতে এই ধরনের হামলা দিল্লির রাস্তায় এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।


নারী আন্দোলনকারীদের যৌন হেনস্থার গুরুতর অভিযোগ

দমনপীড়নের মাত্রা এখানেই থেমে থাকেনি। আম আদমি পার্টির (আপ) শীর্ষ নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ সরকার ও দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তিনি জানান, আন্দোলন চলাকালীন একাধিক নারী শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারী পুলিশের হাতে মারাত্মকভাবে যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছেন। সৌরভ ভরদ্বাজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যেসব পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তা আন্দোলনকারী নারীদের যৌন হেনস্থা করার মতো জঘন্য অপরাধে যুক্ত, তাদের চিহ্নিত করা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বা তাঁর সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।”

সোমবারের হামলায় গুরুগ্রামের ২৫ বছর বয়সী তরুণ শেখ এরশাদ মনসুরি গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর মুখমণ্ডল ও গলায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছররার মতো অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। বুধবার তাঁর তিন ঘণ্টাব্যাপী একটি জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের ফলে তিনি দৃষ্টিশক্তিও হারাতে পারেন। অভিযোগ উঠেছে, প্রায় ৪০-৫০ মিটার দূর থেকে র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (র‌্যাফ) এক জওয়ান পেলেট গান বা অনুরূপ কোনো মারাত্মক অস্ত্র থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। যদিও দিল্লি পুলিশ পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে, তবে ক্ষতের প্রকৃতি ভিন্ন কথা বলছে।

'জনতার দরবার' জন্তোর মন্তরে: সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ
সরকারের চরম দমনপীড়ন সত্ত্বেও আন্দোলন দমানো সম্ভব হয়নি। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বলিউড তারকা, অভিভাবক থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ—সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। দিল্লির রাজপথে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের ঢল নেমেছে। অনেককে স্বেচ্ছায় আন্দোলনকারীদের মাঝে খাবার-পানি বিতরণ করতে দেখা গেছে।

.এদিকে, বিক্ষোভের তীব্রতায় চাপের মুখে পড়ে দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি জে পি নড্ডা আন্দোলনকারী সংগঠন 'ককরোচ জনতা পার্টির' (সিজেপি) নেতাদের আলোচনার জন্য তাঁর বাসভবনে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু আন্দোলনকারীরা সেই প্রস্তাব একবাক্যে খারিজ করে দিয়েছেন। সিজেপির মুখ্য মুখপাত্র সৌরভ দাস সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, "বন্ধ ঘরের ভেতরে বা মন্ত্রীর বাড়িতে কোনো গোপন বৈঠক হবে না। জন্তোর মন্তরে 'জনতার দরবার' বসেছে, মন্ত্রীদের যদি কথা বলতে হয়, তবে সাধারণ মানুষের কাছেই তাঁদের আসতে হবে।"

বুধবার লোকসভা ও রাজ্যসভায় ইন্ডিয়া জোটের বিরোধী সংসদ সদস্যরা কালো কাপড় পরে প্রতিবাদে অংশ নেন। সমাজবাদী পার্টি প্রধান অখিলেশ যাদব এবং কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সহ সমস্ত বিরোধী নেতৃত্ব আন্দোলন কারীদের প্রতি সমর্থন জানান এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্ব পদত্যাগ দাবি করেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বুধবার কেন্দ্রীয় দিল্লির অন্তত ১৬টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। পুরো এলাকা জুড়ে এখন থমথমে উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন—শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং মামলা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা একচুলও নড়বেন না।