→ পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন ফ্রান্সিস হালজেন→ চালু হয়েছে ৩০ ব্যাংকের বন্ধ কিউ-ক্যাশের সব সেবা→ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধে কঠোর পদক্ষেপ চায় সংসদীয় কমিটি→ যেসব অঞ্চলে টানা চার দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি→ মা ইলিশ রক্ষায় সাগর-নদীতে আজ থেকে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু
No icon

আন্দোলনের মধ্যেই এনসিটির দায়িত্ব পাচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ড

মৌলিক তথ্য গোপন রেখে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে। গত ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে এনসিটি পরিচালনার খসড়া চুক্তি অনুমোদন করে। গতকাল বুধবার জানা গেল, চট্টগ্রাম বন্দরের সর্ববৃহৎ এই টার্মিনাল পরিচালনার কাজটি ডিপি ওয়ার্ল্ডই পেয়েছে।প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার ঢাকায় চূড়ান্ত চুক্তি হচ্ছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশ (সাবেক বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) আজ বিকেলে কনসেশন বা পরিচালনার অধিকার চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ইসা করিমসহ ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন।বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার বিরুদ্ধে বন্দরের শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যেই সরকার চুক্তিটি করতে যাচ্ছে। এনসিটি নিয়ে চুক্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দর অচল করার ঘোষণা দিয়েছে একাধিক শ্রমিক সংগঠন। এর মধ্যে বিএনপিপন্থি এবং জামায়াত সমর্থিত শ্রমিক সংগঠন রয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।

জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ১৫ বছর এনসিটি পরিচালনা করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। কিন্তু তারা মোট কত বিনিয়োগ করবে, নতুন কী যন্ত্রপাতি সংযুক্ত করবে, প্রতি কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাবদ বন্দর কত টাকা ফি পাবে, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করলে বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে গুরুত্বপূর্ণ এসব বিষয়ে কথা বলতে চাইছে না বন্দর কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম বন্দরের পর্ষদে থাকা দুই সদস্য এ ব্যাপারে সমকালকে কিছু জানাতে পারেনি।জানতে চাইলে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সমকালকে বলেন, দেশি-বিদেশি ও বহুজাতিক তিনটি পক্ষ প্রস্তাব জমা দিলেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানিকেই গত ১ সেপ্টেম্বর সবুজ সংকেত দেওয়া হয়। এখন হবে চূড়ান্ত চুক্তি। দেশের স্বার্থ রক্ষা করেই সরকার এই চুক্তি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এর বেশি কিছু এখন বলা যাবে না।বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সমকালকে বলেন, দেশ তো শুধু মন্ত্রীর নয়, আমাদেরও। চুক্তির আগে দেশের ১৬ কোটি মানুষ কেন জানবে না বিদেশি প্রতিষ্ঠান এনে আমাদের কী লাভ হচ্ছে? কত টাকা নতুন বিনিয়োগ করছে তারা? চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করলে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে? তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে এনসিটি পরিচালনার বিষয়ে এসব মৌলিক তথ্য দেশবাসীকে জানানো উচিত।

চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান চুক্তি উপলক্ষে এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন। গতকাল বিকেলে তাঁকে ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। প্রসঙ্গ জানিয়ে খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি। বন্দরের দুজন বোর্ড মেম্বারের কাছ থেকে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তারা কিছু জানেন না বলে মন্তব্য করেন। এ ব্যাপারে কথা বলতে বিধিনিষেধ রয়েছে বলেও জানান তারা।এনসিটি বিদেশিদের হাতে না দেওয়ার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি ও শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। জাতীয়তাবাদী সিবিএ নেতা ও জামায়াত সমর্থিত ইসলামী সংঘের শ্রমিক নেতারাও আছেন আন্দোলনে। এই দাবিতে টানা ৯ দিন বন্দর অচল করে রাখার ঘটনাও ঘটেছে। গত দুই মাস ধরে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, মশাল মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সর্বশেষ ৫ সেপ্টেম্বর বন্দর ভবনের সামনে হয়েছে বিক্ষোভ কর্মসূচি।চট্টগ্রাম বন্দরের চালু থাকা চারটি কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সবচেয়ে বড়। চট্টগ্রাম বন্দরে হ্যান্ডলিং হওয়া কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ হয় এনসিটিতে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এবং সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) কাঠামোর অধীনে এনসিটি পরিচালনার কাজ ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সে সময় ওই উদ্যোগ পরিণতি পায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার এনসিটির দায়িত্ব বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার কার্যক্রম  শুরু করে।অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এ বিষয়ে চুক্তির জোর আলোচনা শুরু হলে আন্দোলনে যায় বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। অন্তর্বর্তী সরকার গত ৮ ফেব্রুয়ারি এনসিটি বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত করে। পরে বিএনপির নতুন সরকার গত ৪ জুন দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়।

যেসব কারণে চূড়ান্ত হলো ডিপি ওয়ার্ল্ড

এনসিটি নিয়ে দেশি, বহুজাতিক ও বিদেশি তিনটি পক্ষ আলাদাভাবে প্রস্তাব জমা দিলেও ডিপি ওয়ার্ল্ড সবার আগে প্রস্তাব জমা দেয়। তাছাড়া বিশ্বের ৪০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক বন্দরে কাজ করার অভিজ্ঞতা, দক্ষ জনবল ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সক্ষমতা থাকা ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ এগিয়ে দিয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে।তা ছাড়া সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) ও সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) কাঠামোর ভিত্তিতে এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দেয় ডিপি ওয়ার্ল্ড। এ ব্যবস্থায় টার্মিনাল পরিচালনা, মাশুল আদায় ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের দায়িত্ব থাকবে অপারেটরের হাতে। বিনিময়ে বন্দর শুধু নির্ধারিত রাজস্ব পাবে। সাইফ-কসমস-এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস কনসোর্টিয়াম নামের তিন প্রতিষ্ঠানের জোট ইজারা না চেয়ে এনসিটি শুধু পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছিল। দেশি বহুজাতিক গ্রুপ এমজিএইচ গ্রুপ পিপিপিএর আওতায় দীর্ঘ মেয়াদে ইজারা চেয়েছিল।